হার্ট কিভাবে কাজ করে বিষয়টি সম্পর্কে অনেকেরই জানার কৌতুহল থাকে। নিংসন্দেহে এটি আমাদের শরীরের অন্যতম একটি প্রধান অঙ্গ। আমাদের ভালভাবে বেচে থাকার জন্য হার্টের সুস্থতা প্রয়োজন।

হৃদযন্ত্রের সুস্থতা নিরুপনে আগে বুঝা দরকার স্বাভাবিক অবস্থায় হৃদপিন্ড কিভাবে কাজ করে, কি কি উপাদান নিয়ে হৃদপিন্ড গঠিত এবং হৃদপিন্ড সঠিকরুপে কাজ করার জন্য এর উপাদানগুলির ভূমিকা কতটা গুরত্বপূর্ন – বিষয়গুলি নিয়েই আজকের আর্টিকেলে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করব।

হৃদপিন্ড বা হার্ট কি?

হৃদপিন্ড আমাদের হাতের মুষ্টি আকারের একটি অরগান যা পাম্প করার মাধ্যমে সমস্ত শরীরে রক্ত পৌঁছে যায়।হার্ট রক্ত সংবহনতন্ত্রের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং শরীরের তিনটি প্রধান অরগানের মধ্যে একটি। এই  রক্ত সংবহনতন্ত্র সমস্ত শরীরের বিভিন্ন প্রকার রক্তনালীর এক প্রকারের নেটওয়ার্ক বলা চলে যা জালের মত সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে আছে। এই রক্তনালীগুলো হল আর্টারি, ভেইন, কেপিলারি ইত্যাদি যা হৃদপিন্ড থেকে সমস্ত শরীরে রক্ত সরবরাহ করে এবং সমস্ত শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করে পুনরায় হার্টে ফেরত আনে।

রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি শরীরের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কোষ সমুহে সরবরাহ করা হয় ফলে তারা সচল থাকতে পারে। বিনিময়ে সেখান থেকে রক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড বহন করে হার্টের মাধ্যমে ফুসফুসে সরবরাহ করে ফলে আমরা শ্বাস প্রশ্বাস আদান-প্রদান করতে পারি।

হার্টের ভিতরে ভাল্ব থাকে যা রক্ত সঠিক দিকে চলাচল করতে সহায়তা করে। আমাদের হার্টে  ইলেকট্রিকাল সিস্টেম হৃদস্পন্দনের হার এবং ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে। একটি সুস্থ হার্ট আপনার শরীরের সঠিক মাত্রায় নির্ধারিত পরিমানে রক্ত সরবরাহ করতে পারে। যদি কোন রোগের কারণে হার্ট দুর্বল হয়ে যায় তখন হার্ট আপনার অঙ্গ প্রত্যঙ্গে প্রয়োজনিয় পরিমানে রক্ত সরবরাহ করতে ব্যর্থ হবে। ফলে, অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলি তাদের নিজ নিজ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবেনা।

যদি ইলেকট্রিকাল সিস্টেমে বা বা স্নায়ু তন্ত্রে বা এন্ডোক্রাইন সিস্টেমে কোন সমস্যা হলেও হার্টের পক্ষে পাম্পিং কাজ কঠিন হয়ে যায়। ফলে আপনার হার্ট বিট এবং রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়না।

এই পোস্টের আলোচ্য বিষয় হল, হার্ট কিভাবে কাজ করে। যা বুঝার সুবিধার্থে হার্টের আনুষঙ্গিক কিছু বিষয়ও চলে আসবে।

হৃদপিন্ডের গঠন:

হৃদপিন্ড বক্ষ পাজরের কেন্দ্রে ফুসফুসের নিকটে অবস্থিত। এর চারটি ফাঁকা চেম্বার রয়েছে যা মাংস এবং অন্যান্য টিস্যু দিয়ে আবৃত। এই চেম্বারগুলো একটি অপরটির সাথে হার্ট ভাল্ব দ্বারা পৃথক থাকে যার ফলে রক্ত সঠিক দিক মোতাবেক চলতে পারে।

  • হার্টের চেম্বার

হৃদপিন্ডে চেম্বারের সংখ্যা চারটি। এর মধ্যে বামদিকে থাকে দু’টি এবং ডানদিকে থাকে দু’টি। হৃদপিন্ডের এই বাম ও ডান পাশ একটি পাতলা মাংসপেশি দ্বারা বিভক্ত যাকে সেপ্টাম বলে। বাম ও ডানদিকের উপরের চেম্বার দু’টিকে বলা হয় এট্রিয়া, একবচনে এট্রিয়াম। এবং উভয় পাশের নিচের চেম্বার দু’টিকে বলা হয় ভেন্ট্রিকস। এট্রিয়াম ভেন্ট্রিকলস এর তুলনায় আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট।

  • হার্টের টিস্যু:

তিন স্তরের টিস্যুর সমন্বয়ে হার্ট গঠিত।

    • এন্ডোকার্ডিয়াম : হার্ট চেম্বারের ভিতরের পাতলা আবরণকে এন্ডোকার্ডিয়াম বলে। হার্ট ভাল্বের উপরিভাগেও এই আবরণ থাকে।
    • মায়োকর্ডিয়াম : ইহা হল মধ্যবর্তি স্তর যা পুরু মাংসপেশি দিয়ে গঠিত। এই মাংসপেশি সংকোচন প্রসারণের মাধ্যমে সারা দেহে হার্ট থেকে রক্ত সরবরাহ হয়।
    • পেরিকার্ডিয়াম: ইহা হল হার্টের বাহিরের আবরণ যা থলের মত হার্টকে ঢেকে রাখে। পেরিকার্ডিয়াম টিস্যুর পাতলা আবরণ দিয়ে গঠিত যা হার্টকে সঠিক জায়গায় ধরে রাখতে সহায়তা করে। এর ভিতরে কিছু তরল পদার্থ থাকে যা হৃদস্পন্দনের সময় ঘর্ষণ এড়াতে সহায়তা করে।
  • হার্ট ভাল্ব কয়টি ও কিকি?

আমরা আগেই জেনেছি যে, হৃদপিন্ডের ভিতর চারটি চেম্বার রয়েছে। উপরের অংশে দু’টি এট্রিয়া এবং নিচের অংশে দু’টি ভেন্ট্রিকলস। হার্টের এক চেম্বার থেকে অপর চেম্বারে রক্ত প্রবাহের সময় হার্ট ভল্বের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

হার্টের প্রতিটি চেম্বারের জন্য একটি করে ভাল্ব রয়েছে। হৃদপিন্ডে ভাল্বের সংখ্যা চারটি –

  • ট্রাইকাসপিড ভাল্ব: হৃদপিন্ডের ডান পাশের এট্রিয়াম ও ভেন্ট্রিকলস এর মাঝে এই ভাল্বের অবস্থান। এর মাধ্যমে রক্ত ডান এট্রিয়াম থেকে ডান ভেন্ট্রিকলসে প্রবেশ করে। হৃদপিন্ডের ভাল্ব রক্তের বিপরীতমুখী প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, এর উপস্থিতিতে ডান ভেন্ট্রিকলস থেকে ডান এট্রিয়ামে রক্ত যেতে পারেনা।
  • পালমোনারি ভাল্ব বা পালমোনিক ভাল্ব: এর সাহায্যে হৃদপিন্ডের ডান ভেন্ট্রিকলস পালমোনারি আর্টারি থেকে পৃথক থাকে। পালমোনিক ভাল্ব হৃদপিন্ডের ডান ভেন্ট্রিকলস থেকে রক্ত পাম্পিং এর মাধ্যমে পালমোনারি আর্টারিতে যেতে অনুমতি প্রদান করে। এই পালমোনারি আর্টারি দিয়েই রক্ত পরিশুদ্ধ লাভের জন্য ফুসফুসে গমন করে।

পালমোনারি ভাল্বের উপস্থিতির কারণে রক্ত বিপরীত দিকে প্রবাহিত হতে পারেনা। অর্থাৎ পালমোনারি আর্টারি থেকে রক্ত ডান ভেন্ট্রিকলসের যেতে পারেনা।

  • মিট্রাল বা বাইকাসপিড ভাল্ব: মিট্রাল ভাল্ব হৃদপিন্ডের বাম পাশের এট্রিয়াম ও ভেন্ট্রিকলসের মাঝে অবস্থান করে। এই ভাল্বের সাহায্যে রক্ত বাম এট্রিয়াম থেকে বাম ভেন্ট্রিকলসে প্রবেশ করে।
  • এওয়ার্টিক ভাল্ব: হৃদপিন্ডের বাম ভেন্ট্রিকলস এবং এওয়ার্টার মাঝে অবস্থিত। এই ভাল্ব রক্তকে বাম পাশের ভেন্ট্রিকলস থেকে এওয়ার্টায় প্রবেশের অনুমতি দেয়। কিন্তু এওয়ার্টা থেকে রক্ত বাম ভেন্ট্রিকলসে যেতে বাধা দেয়।

হার্ট ভাল্ব কিভাবে কাজ করে?

যেহেতু হৃদপিন্ডের মাংসপেশী সংকোচন-প্রসারণ হয়, এর ফলে হৃদপিন্ডের ভাল্ব খুলে ও বন্ধ হয়। সুনির্দিষ্ট সময়ে হৃদপিন্ডের ভাল্বের এই খুলে যাওয়া ও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই রক্ত হার্টের এট্রিয়াম থেকে ভেন্ট্রিকলসে প্রবেশ করে এবং হার্টের ভেন্ট্রিকলস থেকে রক্ত বের হতে পারে।

স্বাভাবিক অবস্থায় হার্ট ভাল্ব কাজ করার ধারাবাহিক ধাপগুলো উল্লেখ করা হল যার মাধ্যমে রক্ত সঠিক দিকে প্রবাহিত হয়-

  • যখন বাম ভেন্ট্রিকল প্রসারিত হয় তখন এওয়ার্টিক ভাল্ব বন্ধ হয় এবং মিট্রাল ভাল্ব খুলে যায়। এর ফলে বাম এট্রিয়াম থেকে বাম ভেন্ট্রিকলে রক্ত প্রবেশের সুযোগ পায়।
  • এরপর বাম এট্রিয়াম সংকুচিত হয় ফলে অধিক পরিমানে রক্ত বাম এট্রিয়াম থেকে বাম ভেন্ট্রিকলে প্রবেশ করতে পারে।
  • পরে বাম ভেন্ট্রিকল সংকুচিত হলে মিট্রাল ভাল্ব বন্ধ হয় এবং এওয়ার্টিক ভাল্ব খুলে যায়। এর ফলে বাম ভেন্ট্রিকল থেকে রক্ত এওয়ার্টায় প্রবেশ করতে পারে এবং তদঅনুসারে ‍আর্টারি দিয়ে সারা দেহে রক্ত সরবরাহ হয়।
  • এরপর, বাম ভেন্ট্রিকল প্রসারিত হয় এবং ডান ভেন্ট্রিকলও প্রসারিত হয়। এর ফলে পালমোনারি ভাল্ব বন্ধ হয় এবং ট্রাইকাসপিড ভাল্ব খুলে যায়। সারা দেহের সংগৃহিত দুষিত রক্ত যা ভেনাকাভার মাধ্যমে ডান এট্রিয়ামে জমা হয়, ঐ দুষিত রক্ত তারপর খুলে যাওয়া ট্রাইকাসপিড ভাল্বের মাধ্যমে ডান এট্রিয়াম থেকে ডান ভেন্ট্রিকলে প্রবেশ করে।
  • এরপর যখন বাম ভেন্ট্রিকল সংকুচিত হয় তখন ডান ভেন্ট্রিকলও সংকুচিত হয়। ফলে পালমোনিক ভাল্ব খুলে যায় এবং ট্রাইকাসপিড ভাল্ব বন্ধ হয়। এর মাধ্যমে ডান ভেন্ট্রিকল থেকে রক্ত পালমোনারি আর্টারিতে প্রবেশের সুযোগ পায় যা পরবর্তিতে ফুসফুসে গিয়ে পৌঁছে যায়। এরপর ফুসফুস থেকে পরিশুদ্ধ লাভ করে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত হার্টের বাম এট্রিয়ামে পালমোনারি ভেইনের মাধ্যমে প্র্রবেশ করে।

হার্টবিট কিভাবে হয়?

হার্টবিট হল হৃদযন্ত্রের সংকোচন-প্রসারণ যার ফলে রক্ত হৃদপিন্ড থেকে পাম্প হয়ে সারা দেহে সরবরাহ হয়। আপনার হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন কত গতিতে হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে হৃদপিন্ডের ইলেক্ট্রিকাল সিস্টেম।

এট্রিয়া ও ভেন্ট্রিকলসের সংকোচনের ফলে হার্ট বিট তৈরি হয়। যখন হার্ট বিট (beat) করে তখন lub-DUB শব্দ উৎপন্ন হয়। আপনি কানে স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে কারোর বক্ষ পাজর থেকে এই শব্দ শুনতে পাবেন।

  • যখন এট্রিয়া পাম্প করে রক্ত ভেন্ট্রিকলস -এ পাঠায় তখন রক্তের বিপরীতমুখি প্রবাহ প্রতিরোধ করার জন্য এট্রিয়া ও ভেন্ট্রিকলস এর মধ্যবর্তি ভাল্ব বন্ধ হয়ে যায়।
  • তারপর ভেন্ট্রিকলস থেকে রক্ত হার্টের বাইরে বের করার জন্য যখন ভেন্ট্রিকলস পাম্পিং কার্যক্রমের আওতায় সংকোচন হয়, তখন এওয়ার্টিক ও পালমোনারি ভাল্ব বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে “DUB” শব্দ তৈরি হয়।

হৃদপিন্ডের ইলেক্ট্রিকাল সিস্টেম:

বৈদ্যুতিক সংকেতের দ্বারা হৃদপিন্ডের মাংসপেশী সংকোচন-প্রসারণ হয়। আপনার হৃদপিন্ডে একটি বিশেষ ধরণের ইলেক্ট্রিকাল সিস্টেম রয়েছে যাকে cardiac conduction system বলা হয়। এই সিস্টেমের সাহায্যে heat beat এর হার এবং ছন্দ নিয়ন্ত্রিত হয়।

প্রতিটি হার্টবিটের সময় একটি ইলেক্ট্রিকাল সিগনাল হৃদপিন্ডের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত যাতায়ত করে। এই সিগনাল চলাচলের কারণে হার্ট সংকোচিত হয়, ফলে রক্ত পাম্পিং হয়ে বেরিয়ে যায়। হার্টবিটের এই পদ্ধতি নিচের কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:

  • এই সিগনাল হার্টের কতগুলো কোষের গুচ্ছে শুরু হয় যাকে পেসমেকার বলে। পেসমেকার হৃদপিন্ডের ডান পাশের এট্রিয়ামের সিনোএট্রিয়াল নোডে (sinoatrial node) অবস্থিত।
  • সিগনালটি প্রথমে এট্রিয়ায় চলাচল করে যার ফলে রক্ত এট্রিয়া থেকে ভেন্ট্রিকলসে চলে আসে।
  • এরপর ইলেক্ট্রিকাল সিগনাল আরোও নিচে এট্রিয়া ও ভেন্ট্রিকলসের মাঝামাঝি স্থানের পেসমেকার কোষে চলে যায় যাকে এট্রিওভেন্ট্রিকুলার নোড (atrioventricular node) বলে। এখানে এসে সিগনালটি কিছুটা ধীরগতি সম্পন্ন হয় যার ফলে ভেন্ট্রিকলস রক্তে পরিপূর্ণ হওয়ার সুযোগ পায়।
  • এট্রিওভেন্ট্রিকুলার নোড অপর একটি সিগনাল তৈরি করে যা ভেন্ট্রিকলসের প্রাচির বরাবর ভ্রমন করে। ফলে ভেন্ট্রিকলস সংকুচিত হয়ে রক্ত হৃদপিন্ডের বাইরে বেরিয়ে যায়।
  • পরে ভেন্ট্রিকলস প্রসারিত হয় এবং পরবর্তি হার্টবিট তৈরির পদ্ধতি একইভাবে শুরু হয়ে চলতে থাকে।

এরিথমিয়া (arrhythmia) এবং Conduction disorders এর ফলে হার্টের ইলেক্ট্রিকাল সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

শরীরে রক্ত চলাচল কিভাবে হয়?

রক্ত সংবহনতন্ত্রের সাহায্যে সারা দেহে রক্ত সঞ্চালিত হয়। বিভিন্ন প্রকার ছোট-বড় রক্তনালীর ভিতর দিয়ে আমাদের দেহের প্রতিটি কোষে রক্ত সরবরাহ হয় যার ফলে কোষগুলি প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং অক্সিজেন পেয়ে থাকে।

শরীরের রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি বিষয়ে পরিস্কার ধারণা পেতে চলুন প্রথমে রক্তনালী সম্পর্কে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

রক্তনালীর ভিতর দিয়ে আমাদের দেহে রক্ত চলাচল হয়।

রক্ত নালী কত প্রকার?

রক্ত নালী কয়েক প্রকারের হয়ে থাকে। যেমন,

এওয়ার্টা: হৃদপিন্ড থেকে পাম্পিং এর মাধ্যমে রক্ত বের হয়ে সবচেয়ে বড় যে রক্ত নালীর ভিতর দিয়ে প্রথমে প্রবাহিত হয় তাকে aorta বলে। Aorta সরাসরি হার্টের সাথে যুক্ত থাকে। এখান থেকে রক্ত পরবর্তিতে বিভিন্ন আর্টারিতে ভাগ হয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রবাহিত হয়।

আর্টারি: Aorta থেকে যে নালীর মাধ্যমে রক্ত ভাগ হয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশের দিকে অগ্রসর হয় তাকে আর্টারি বলে। এরা অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত।

আর্টারিওলস: আর্টারির ক্ষুদ্রতর শাখা নালী হল আর্টারিওলস।

ভেনিউলস: Vein বা শীরার ক্ষুদ্রতর শাখাকে venules বলে। এখান থেকেই শীরা রক্ত সংগ্রহ করে হার্টের দিকে ধাবমান হয়।

ভেইন বা শীরা: Vein এর বাংলা অর্থ হল শীরা যা শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে হার্টে পৌঁছে দেয়।

ভেনাকাভা: সবচেয়ে বড় vein কে venavava বলা হয়। সারা দেহেরে শীরা বা vein গুলির রক্ত venacava তে গিয়ে মিলিতি হয়। তার পর venacava সরাসরি হার্টের সাথে যুক্ত হয়ে সংগৃহিত রক্ত হার্টে পৌঁছে দেয়।

আমাদের দেহে দুটি venacava রয়েছে। একটি হল superior venacava যা শরীরের উপরিভাগের রক্ত সংগ্রহ করে হার্টে নিয়ে যায়। অপরটি হল inferior venacava যা শরীরের নিম্নভাগের রক্ত হার্টে পৌঁছে দেয়।

ক্যাপিলারিস: ক্যাপিলারিস হল সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির খুবই পাতলা প্রাচীর বিশিষ্ট রক্ত নালী যেখানে arterioles এবং venules একত্রিত হয়। এই ক্যাপিলারিসে প্রবাহিত রক্তের মাধ্যমে শরীরের সমস্ত কোষে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করা হয় এবং কোষ থেকে কার্বন ডাই অক্সাইডসহ অন্যান্য বর্জ পদার্থ সংগ্রহ করা হয়। এরপর venules এই দুষিত বা কার্বন ডাই অক্সাইড মিশ্রিত রক্ত সংগ্রহ করে vein ও venacava এর মাধ্যমে হার্টে পৌঁছে দেয়।

এছাড়াও কয়েকটি বিশেষ রক্ত নালীর নাম এবং তার কাজ আমাদের জানা দরকার। যা রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি বুঝতে সহায়ক হবে। যেমন-

করোনারি আর্টারি: এটি হল Aorta থেকে উৎপন্ন একটি শাখা আর্টারি যা হৃদপিন্ডের টিস্যু ও মাংসপেশীতে রক্ত সরবরাহ করে। এই আর্টারি থেকে সরবরাকৃত রক্তের মাধ্যমে হার্ট কর্মক্ষম থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেয়ে থাকে।

পালমোনারি আর্টারি: আমরা জানি ‍আর্টারি দিয়ে কেবল বিশুদ্ধ রক্ত প্রবাহিত হয়। তবে, পালমোনারি আর্টারি হল শরীরের একমাত্র আর্টারি যার ভিতর দিয়ে দুষিত রক্ত প্রবাহিত হয়। এই পালমোনারি আর্টারি হৃদপিন্ড থেকে ফুসফুসে রক্ত বহন করে।

পালমোনারি ভেইন:  সমস্ত vein দুষিত রক্ত বহন করে, ব্যাতিক্রম শুধ এর ক্ষেত্রে। এই পালমোনারি ভেইন দিয়ে ফুসফুস থেকে হার্টে বিশুদ্ধ রক্ত বহন করা হয়।

রক্তনালীর কথা বলতে গিয়ে শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছে গেলাম। অবাক হওয়ার মত একটি তথ্য হচ্ছে, আমাদের এই বিভিন্ন প্রকার রক্তনালীর দৈর্ঘ হল ৬০,০০০ মাইলের চেয়েও বেশী যা পুরো পৃথিবীকে দুইবার প্রদক্ষিণ করার চেয়ে বেশী।

মানব দেহে রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি কত কয়টি?   

আমাদের দেহে মোট তিনটি রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি রয়েছে। যেমন-

  • পালমোনারি সারকুলেশন : এর মাধ্যমে হার্ট থেকে দুষিত রক্ত পালমোনারি আর্টারির মাধ্যমে ফুসফুসে যায়। এরপর ফুসফুসে পরিশুদ্ধ হওয়ার পর পালমোনারি ভেইন এর মাধ্যমে পুনরায় হার্টে গিয়ে মিলিত হয়।
  • সিস্টেমিক সারকুলেশন : এই রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতির মাধ্যমে বিশুদ্ধ রক্ত হার্ট থে বের হয়ে এওয়ার্টা, আর্টারি, আর্টারিওলস ও পরিশেষে ক্যাপিলারিসের মাধ্যমে শরীরের সমস্ত কোষে সরবরাহ করা হয়। একই সাথে রক্ত সমস্ত কোষ থেকে দুষিত বর্জ্য সংগ্রহ করে। তারপর ভেনিউলস, ভেইন ও ভেনাকাভা হয়ে হার্টে গিয়ে পৌঁছে যায়।
  • করোনারি সারকুলেশন : এর মাধ্যমে হার্ট তার স্বীয় কাজ-কর্ম সম্পাদনের জন্য হার্ট টিস্যুর যে পুষ্টির প্রয়োজন তা নিশ্চিত করা হয়। হার্ট থেকে বিশুদ্ধ বা অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত বের হওয়ার হওয়ার পর করোনারি আর্টারির মাধ্যমে হার্টে সরবরাহ দেওয়া হয়। অপরদিকে করোনারি ভেইনের মাধ্যমে হার্টের টিস্যু বা কোষ থেকে সংগৃহিত দুষিত রক্ত হার্টে পৌছানো হয়।

হার্টের কয়েকটি রোগের নাম:

রক্ত সংবহনতন্ত্রের ইংরেজি নাম হল কার্ডিওভাসকুলার ‍সিস্টেম। এর ভিতর হার্টসহ শরীরের সামগ্রিক রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত। রক্ত সংবহনতন্ত্রের রোগ বলতে হার্টসহ রক্ত সঞ্চালন সিস্টেমের যেকোন রোগ বা রোগের অবস্থাকে বুঝানো হয়। অপরদিকে  হার্টের রোগ বা হৃদরোগ শুধু হার্টের রোগগুলিকেই বুঝায়।

নিচে হার্টের গুরত্বপূর্ণ রোগগুলির নাম বলা হল-

  • Coronary Artery Disease: এর অপর নাম Coronary Heart Disease যা হার্টের সবচেয়ে কমন বা বহুল পরিচিত একটি রোগের নাম।
  • Congenital Heart Defect: যখন কোন মানুষ হৃদযন্ত্রের কোন ত্রুটি নিয়ে জন্মলাভ করে তখন এই রোগের অবস্থা তৈরি হয়। এটি আবার কয়েক ধরণের হতে পারে, যেমন-
    • হার্টের অস্বাভাবিক রকমের ভাল্ব;
    • হার্ট সেপ্টাম যার মাধ্যমে হার্টের চেম্বারগুলি পৃথক থাকে সেখানে কোন ত্রুটি থাকা;
    • Atresia অর্থাৎ যখন কোন হার্ট ভাল্বে অনুপস্থিতি নিয়ে জন্ম গ্রহন হয়।
  • Arrhythmia: হৃদরোগের এই অবস্থা তখন তৈরি হয় যখন হার্টে অনিয়মিতভাবে হৃদ স্পন্দন হয়। হার্টের ইলেক্ট্রিক্যাল সিস্টেম যখন সঠিকভাবে কার্য সম্পাদানে ব্যর্থ হয় তখন এই সমস্যা তৈরি হয়। কয়েক ধরণের arrhythmia দেখা দিতে পারে, যেমন-
    • Tachycardia: যখন হার্টবিট স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত হয়;
    • Bradycardia: এক্ষেত্রে হার্টবিট ধীরে হয়;
    • Premature contrations: ইহা early heartbeat এর সাথে সম্পর্কিত;
    • Atrial fibrillation: এখানে অনিয়মিত ধরনের হৃদ স্পন্দন দেখা দেয়;
  • Dilated cardiomyopathy: এই রোগের ক্ষেত্রে হার্টের চেম্বার প্রসারিত হয়ে যায়। এই প্রসারণের ফলে হৃদপিন্ড মাংসপেশী পাতলা হতে থাকে। হৃদপিন্ডের এই অবস্থার কারণে পরবর্তিতে হার্ট অ্যাটাকসহ অন্যান্য জটিল অবস্থা তৈরি হতে পারে।
  • Myocardial infarction: যাকে হার্ট অ্যাটাকও বলা হয়। এর ফলে হার্টে রক্ত প্রবাহে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয় যার কারণে হার্ট মাংপেশির একাংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায়। হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে প্রধান কারণ হল করোনারি আর্টারিতে plaque, জমাট রক্ত বা blood clot তৈরি হওয়া যা হার্টে রক্ত প্রবাহে বাধা দেয়।
  • Heart failure: যখন কোন মানুষের হার্ট ফেইলিউর হয় তখনও হৃদপিন্ড কাজ করে তবে যেভাবে কাজ করার কথা সেভাবে নয়। হার্ট ফেইলিউর এর একটি উদাহারণ হল Congestive heart failure. হার্ট ফেইলিউর সাধারনত: করোনারি আর্টারিতে রোগ, উচ্চ রক্ত চাপ, ‍এরিথমিয়া ইত্যাদি রোগের কারণে হয়ে থাকে। এই সব রোগের কারণে হৃদপিন্ড সঠিক পর্যায়ে পাম্পিং করতে পারেনা।
  • Hypertropic cardiomyopathy: এটি জেনেটিক বা বংশগত কারণে হতে পারে। এই রোগে হার্ট মংশপেশীর প্রাচির পুরু মোটা বা পুরু হয়ে যায় ফলে হৃদপিন্ড সঠিকভাবে পাম্পিং করতে পারেনা।
  • Mitral valve regurgitation: এই রোগের কারণে হৃদপিন্ডের মিট্রাল ভাল্ব সম্পুর্নরুপে বন্ধ হয়না ফরে হার্টের ভিতর রক্তের বিপরীতমুখি প্রবাহ হয়।
  • Aortic stenosis: এই ক্ষেত্রে হৃদপিন্ডের পালমোনারি ভাল্ব পুরু হয়ে মিশে যায় ফলে সম্পুর্নভাবে খুলতে পারেনা। ফলে হার্টের পক্ষে পাম্প করে রক্ত ডান ভেন্ট্রিকলে পাঠানো কঠিন হয়ে যায়। এছাড়াও, এ রোগে এওয়ার্টিক ভাল্বও সরু হয়ে যাওয়ার কারণে সঠিকভাবে রক্ত প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করে। ফলে বাম ভেন্ট্রিকল থেকে পরিমিত মাত্রায় রক্ত এওয়ার্টায় যেতে পারেনা।