শরীর চর্চা ও দৈহিক পরিশ্রম স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খুবই গুরত্বপূর্ন একটি বিষয়। যা নিয়মিত না করলে আপনি স্থুল দেহের অধিকারি হয়ে যেতে পারেন। স্থুল দেহ এবং মাত্রাধিক ওজন বর্তমান বিশ্বের মানুষের মধ্যে এমন এক সমস্যা যা সচারাচর ‍খুব বেশী দেখা যায়। এমনকি উন্নত বিশ্বেও ওবেসিটি নামের এই স্বাস্থগত সমস্যার হার অনেক বেশী। বিশেষ করে যারা চল্লিশোর্ধ বয়স সম্পন্ন মানুষ তারা খুব ঝুঁকির ভিতর রয়েছে।

দেহের স্থুলতা এমন একটি রোগের অবস্থা যদি আপনি একে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারেন তাহলে ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্ত চাপ, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকসহ আপনাকে অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

এর জন্য প্রয়োজন হল সতর্কতা এবং জন সচেতনতা বৃদ্ধি করা। আপনি যদি একটু স্বাস্থ সচেতন হয়ে চলতে পারেন তাহলে আপনি এটিকে প্রতিরোধ করতে পারবেন। আর যদি ইতিমধ্যে এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন তাহলে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন।

ওবেসিটি বা ওজন বৃদ্ধির উপর সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নিয়মিত শরীর চর্চা এবং দৈহিক পরিশ্রম করে কিভাবে আপনি ওজন বৃদ্ধির সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন- সে বিষয়ে এই আর্টিকেলে তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

চলুন শুরু করা যাক।

অ্যামেরিকার National Health and Examination Survey (NHANES) এর তথ্য মতে যার সীমিতভাবে বিনোদনমুলক কর্মকান্ডে জড়িত তার বেশী সক্রিয় মানুষের তুলনা বেশী দৈহিক ওজন লাভ করে। অন্যান্য গবেষণা থেকেও জানা যায় যে, যারা নিয়মিত কঠোর পরিশ্রম করে তাদের অপেক্ষাকৃত কম পরিশ্রমি বা বসে থেকে জীবন-যাপনে অভ্যস্থ ব্যক্তির তুলনা ওজন কম বৃদ্ধি হয়।

শারীরিক কর্মকান্ড এবং শরীর চর্চা ক্যালরি খরচে (burn) সহায়তা করে। কি পরিমান ক্যালরি খরচ হচ্ছে তা নির্ভর করে আপনি কত সময় ধরে এবং কি পরিমান কঠোরতার সাথে এই দৈহিক কার্যকলাপে লিপ্ত তার উপর। এটি আপনার দৈহিক ওজনের উপরও নির্ভর করে। যেমন, ১০০ কেজি ওজন বিশিষ্ট একজন মানুষ ১ কিলোমিটার দৌড়ালে যে পরিমান ক্যালরি খরচ হবে তা ৭০ কেজি ওজন সম্পন্ন মানুষের চেয়ে বেশী। কারণ এই অতিরিক্ত ৩০ কেজি দৈহিক ওজন বহনের বিষয়টি ক্যালরি খরচের হিসেবে এখানে অন্তর্ভুক্ত।

কিন্তু এই শরীর চর্চা আপনার জন্য আরোও অধিক ফলপ্রসু হবে যদি আপনি এর সাথে ডায়েটিং এবং অন্যান্য ওজন কমানোর কর্মসূচি যোগ করেন। ওজন কমানোর জন্য ডায়েটিং ব্যাতীত শুধ শরীর চর্চায় যে ফলাফল পাওয়া যায় তা তাৎপর্যপূর্ণ নয়। খুবই কম। কারণ, আপনাকে তখন ১ কেজি ওজন কমাতে প্রচুর পরিমানে শরীর চর্চায় মগ্ন হতে হবে।

যাহোক, নিয়মিত শরীর চর্চা স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গুরত্বপূর্ণ অংশ যদি আপনি স্বাস্থ্যসম্মত স্বাভাবিক ওজন দীর্ঘ সময়ের জন্য ধরে রাখতে চান। ওজন কমানোর লক্ষ্যে নিয়মিত শরীর চর্চার আর একটি উপকারি দিক হল, আপনার শরীর থেকে চর্বি অপসারণ lean muscle এর তুলনায় পরিমানে বেশী হবে তাদের চেয়ে যারা শরীর চর্চা ব্যতিরেকে শুধ ডায়েটিং করে।

দৈহিক ব্যায়াম শরীর চর্চার আরোও উপকারি দিক:

  • রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং শরীরের কোষসমুহকে ইনসুলিনের প্রতি অধিক সংবেদনশীল করে; যার ফলে ইনসুলিন রেজিস্টেন্স কমতে থাকে।
  • রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড লেভেল কমিয়ে দেয় এবং ভাল কোলেস্টেরল যাকে HDL কোলেস্টেরল বলে তার পরিমান বাড়িয়ে দেয়।
  • রক্ত চাপ কমাতে সাহায্য করে।
  • পেটের চর্বি কমিয়ে দেয়।
  • হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
  • Endorphin নি:সরণে সহায়তা করে যা মানুষের ভিতর ভাল অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

মনে রাখবেন, এই স্বাস্থ্য সুবিধাগুলি ওজন কমিয়ে বা না কমিয়ে স্বাধীনভাবে অর্জন হয়। আপনি শরীর চর্চার কোন প্রোগ্রাম শুরুর আগে এর ধরণ এবং তীব্রতা বিষয়ে চিচিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।

সাধারণভাবে যে সব ব্যায়ামের সুপারিশ করা হয়:

  • দৈনিক ২০-৩০ মিনিট করে সপ্তাহে কমপক্ষে ৫ দিন মধ্যম পর্যায়ের কোন শরীর চর্চায় অংশ নিন। যদি সপ্তাহে সাত দিনই করতে পারেন তাহলে আরোও ভাল। এই ব্যায়ামের ধরণ হতে পারে যেমন, নিশ্চল বাইসাইক্লিং, ট্রেডমিলে জগিং, মেশিনে সিঁড়ি আরোহণ, আউটডোর জগিং এবং সাঁতার কাটা।
  • এই ব্যায়ামকে ১০ মিনিট করে শেষনে বিভক্ত করতে পারেন।
  • প্রথমে ধীরে ধীরে শুরু করুন, তারপর কোন ব্যথা বা ক্লান্তি এড়াতে আস্তে আস্তে বাড়াতে থাকুন। এভাবে আপনি দৈনিক ৩০-৬০ মিনিট পর্যন্ত মাঝা মাঝি থেকে জোরালো পর্যায়ে শরীর চর্চায় অভ্যস্থ হওয়ার চেষ্টা করুন।
  • ব্যায়ামের ক্ষেত্রে বয়স কোন প্রতিবন্ধক নয়। বৃদ্ধ হয়েও আপনি আস্তে আস্তে শুরু করতে পারেন। এমনি ৭০-৯০ বয়সের অতি বৃদ্ধ, দুর্বল মানুষও শরীর চর্চার মাধ্যমে তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে।

ব্যায়ামের সময় যেসব সতর্কতা অবলম্বন করা ‍উচিত:

জোরালে ব্যায়ামের পূর্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন যদি-

  • আপনি চল্লিশ বছরের বেশী পুরুষ বা ৫০ বছরের অধিক মহিলা হয়ে থাকেন;
  • আপনার হৃদরোগ, শ্বাস কষ্ট, অস্থি সন্ধিতে প্রদাহ থেকে থাকে;
  • কায়িক পরিশ্রমে যদি আপনার বুকে চাপ বা ব্যথা অনুভব হয় বা কোন প্রকার ক্লান্তি লাগে বা শ্বাস-প্রশ্বাস ছোট হয়ে আসে।
  • আপনার যদি coronary heart disease হওয়ার ঝুঁকি থাকে যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল বা হার্ট অ্যাটাকের পারিবারিক কোন ইতিহাস থাকে।
  • আপনি স্থূল শরীরের কেউ হয়ে থাকেন অর্থাৎ যদি আপনার ওবেসিটি থাকে।