উচ্চ রক্ত চাপ নিয়ে আপনি কি সত্যিই চিন্তিত? আসলে, চিন্তার তেমন কিছুই নেই। একটু নিয়ম মেনে চললেই হয়। তাছাড়া, জন্ম যখন হয়েছে, মরতে তো হবেই –  এই চিরন্তন বাণীর কথা সকলেরই জানা। তবে, আমাদের সবার যেন স্বাভবিক মৃত্যু হয়- মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট এই প্রার্থনাই করি। উচ্চ রক্তচাপ  – ইহা রোগের এমন একটি অবস্থা যা একটিু সতর্ক হয়ে চললেই আপনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। অসতর্ক হলেই যত বিপদের আশংকা। তবে, ভয়ের বিষয় হলো যে, এর বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশ পেতে অনেক সময় নিতে পারে। এজন্য আপনার উচিত নিয়মিত মেপে পরীক্ষা করা।

যাহোক, এই আর্টিকেলে উচ্চ রক্তচাপ কি, উচ্চ রক্তচাপ কেন হয়, কত প্রকার, এর চিকিৎসা পদ্ধতি ও প্রতিরোধের উপায় এবং উচ্চ রক্তচাপের পরিণতি কেমন হতে পারে তা নিয়ে বিস্তারিতভাবে তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করব। চলুন – শুরু করা যাক।

উচ্চ রক্তচাপ কি?

উচ্চ রক্তচাপকে হাইপার টেনশনও বলা হয়। যখন আপনার রক্তচাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে যায় সেই অবস্থাই হল উচ্চ রক্তচাপ। কি পরিমান রক্ত শরীরের রক্ত নালি দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং হৃৎপিন্ডের প্রতিটি স্পন্দনের সময় রক্ত প্রবাহের সময় কি পরিমান বাধার সম্মুখিন হতে হয় তা হিসেবে নিয়েই আমাদের রক্তচাপের পরিমাপ করা হয়। যেমন, ধমনীর লুমেন বা ধমনীর ভিতরের এলাকা সরু হয়ে গেলে রক্ত প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হয়। আপনার ধমনী যত বেশী সরু হবে, রক্তচাপ তত বেড়ে যাবে। এভাবে চলতে থাকা অবস্থায় একসময় তা বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যা যেমন হৃদরোগ তৈরি করতে পারে। হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ খুবই সাধারণ একটি রোগ যা সচারাচর অনেক মানুষেরই হয়ে থাকে। মানুষের শরীরে এই অবস্থা তৈরি হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। সাধারনত: প্রথম দিকে আপনি এর কোন লক্ষণ টের নাও পেতে পারেন। কিন্তু লক্ষণ না বুঝা সত্ত্বেও ইহা আপনার শরীরের রক্ত নালী ও বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি সাধন করতে পারে। বিশেষ করে মস্তিষ্ক, হৃৎপিন্ড, চোখ এবং কিডিনি ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। এজন্য, কারোর এই সমস্যা থেকে থাকলে ক্ষতির হাত থেকে বাচার জন্য তার আগে ভাগেই সনাক্ত হওয়া উচিত। তাই নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করা প্রয়োজন। এর ফলে চিকিৎসক সনাক্ত করতে পারবে উল্লেখযোগ্য পরিমানে রক্তচাপ উঠা নামা করছে কিনা। যদি আপনার রক্ত চাপ বেড়ে যায় তাহলে চিকিৎসক আপনাকে কয়েক সপ্তাহের পর্যবেক্ষণে রাখাবেন। এই কারণে যে, রক্তচাপ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে কিনা। আপনার যদি উচ্চ রক্তচাপজনিত কোন সমস্যা ধরা পরে তাহলে চিকিৎসকের স্বরণাপন্ন হওয়া উচিত। কেননা, চিকিৎসাহীন অবস্থায় থেকে গেলে অন্য কোন কঠিন জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ কেন হয়?

হাইপার টেনশন বা রক্তচাপ সাধারণত: দুই প্রকারের হয়- প্রাইমারি হাইপারটেনশন: এই ধরণের উচ্চ রক্তচাপের আরেকটি নাম আছে, তা হল essential hypertension. কোন রকম সনাক্তযোগ্য কারণ ছাড়াই এটি হতে পারে। অধিকাংশ লোক এই প্রাইমারি হাইপারটেনশনে ভুগেন। গবেষকগণ এখনোও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন এর কারণ অনুসন্ধানের জন্য। তবে, ধারণা করা হয় এর পিছনে নিচের বিষয়গুলি ভূমিকা থাকতে পারে-

  • জিনগত বিষয়: কিছু কিছু মানুষের জেনেটিকভাবেই হাইপার টেনশন হয়ে থাকে। এটা হতে পারে জিন পরিবর্তনের মাধ্যমে যাকে আমরা মিউটেশন বলি। অথবা অস্বাভাবিক জিনের কারণে যা পিতামাতা থেকে সন্তানের দেহে স্থানান্তরিত হয়।
  • দৈহিক পরিবর্তন: যদি আপনার শরীরের কোথাও কোন পরিবর্তন হয় তাহলে এর প্রভাব আপনার সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে যায়। উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে সেই ধরণের কোন কিছু। যেমন ধরুন, বয়সগত কারণে আপনার কিডনির কার্যকারিতায় যদি কোন পরিবর্তন সাধন হয় তাহলে এর প্রভাব গিয়ে পড়বে শরীরের লিকুইড এবং ইলেকট্রোলাইটিক ব্যালেন্সের উপর। এর ফলে আপনার রক্ত চাপ বেড়ে যেতে পারে।
  • পরিবেশ: সময়ের পর সময় ধরে যদি আপনি অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুযায়ি চলেন তাহলে একটি পর্যায়ে আপনার উচ্চ রক্তচাপ জনিত সমস্যা তৈরি হতে পারে। অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা যেমন- হতে পারে আপনি শারীরিক ব্যায়ামে অংশ নেন না বা আপনার খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এর ফলে আপনার ওজন বেড়ে যাবে যা হাইপার টেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ সহ আরোও অনেক রোগের কারণ।

সেকেন্ডারি হাইপার টেনশন: এই ধরণের হাইপার টেনশন খুব তারাতারি দেখা দেয় এবং প্রাইমারি হাইপার টেনশনের তুলনায় এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। যে সব বিষয় এই অবস্থা তৈরি করতে পারে তা হল-

  • কিডনি রোগ;
  • অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ এপনিয়া
  • কনজেনিটাল হার্ট ডিফেক্ট
  • থাইরয়েডের কোন সমস্যা;
  • ঔষধের কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া;
  • আইনসিদ্ধ নয় এমন ড্রাগ গ্রহন করা;
  • মদ্যপান
  • এড্রেনাল গ্রন্থির সমস্যা
  • কিছু নির্দিষ্ট এন্ডোক্রাইন টিউমার

উচ্চ রক্ত চাপের লক্ষণ কি কি?

উচ্চ রক্তচাপ সাধারণত: এক প্রকারের নীরব রোগ। অনেক লোকই এর কোন লক্ষণ অনুভব করে না। লক্ষণ প্রকাশ পেতে কয়েক বছর এমনকি দশকও লেগে যেতে পারে। এবং ততদিনে ইহা আরোও অন্যান্য সমস্যা তৈরি করে থাকতে পারে। নিচে কয়েকটি লক্ষণ বলা হল-

  • মাথা ব্যাথা;
  • শ্বাস-প্রশ্বাস ছোট হয়ে যাওয়া;
  • নাক দিয়ে রক্ত পরা;
  • তন্দ্রাচ্ছন্নতা;
  • মুখ মন্ডল লাল হয়ে যাওয়া;
  • বুকে ব্যাথা লাগা;
  • দৃষ্টিগত সমস্যা সৃষ্টি হওয়া;
  • মুত্রে রক্তের উপস্থিতি ধরা পরা;

আপনার যদি এই ধরণের কোন লক্ষণ দেখা দেয় তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন। তবে, উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণের অপেক্ষায় বসে থাকার পরিণতি অনেক সময় ভয়াবহ হতে পারে। এজন্য, সবচেয়ে উত্তম হল, লক্ষণ না বুঝলেও মাঝে মাঝে রক্ত চাপ পরিমাপ করে দেখুন স্বাভাবিক কিনা। এখন প্রায় সব ডক্টরের চেম্বারে এমনকি ফার্মেসিতেও রক্ত চাপ পরিমাপের সুযোগ থাকে। রক্ত চাপ পরিমাপ করার যন্ত্রটি আপনি কিনেও নিতে পারেন। এর ব্যবহার পদ্ধতি খুবই সহজ। আপনি অল্পতেই রপ্ত করতে পারবেন।

আপনার উচ্চ রক্ত আছে কিনা কিভাবে জানতে পারবেন?

উচ্চ রক্তচাপ নির্নয় করা খুব সহজ কাজ। ডক্টরের চেম্বারে যেকোন অসুখ নিয়ে গেলে রুটিন পরীক্ষা হিসেবে তারা আপনার রক্তচাপ পরীক্ষা করবে। অথবা আপনি স্বাভাবিক থেকেও ডক্টরের চেম্বারে গিয়ে অনুরোধ করতে পারেন রক্তচাপ মাপার জন্য। প্রথমবারের পরীক্ষায় যদি দেখা যায় আপনার রক্তচাপ বেশী তাহলে আপনাকে পরবর্তি কয়েকদিন বা সপ্তাহ বার বার মেপে মনিটর করতে হবে। আবার স্বাভাবিক অবস্থায় নামে কিনা তা দেখার জন্য। উচ্চ রক্তচাপ এমন কোন রোগ নয় যে, একবার মেপেই বলে দেওয়ার মত। এর জন্য আপনাকে পর্যবেক্ষণে থেকে বার বার মাপতে হবে। পর্যবেক্ষণে থাকার পর আপনার চিকিৎসক যদি নিশ্চিত হন যে আপনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তাহলে তিনি এর পিছনে কোন দীর্ঘ মেয়াদি কারণ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখেন। যদি আপনার রক্তচাপ বরাবরই বেশী পাওয়া যায়, তাহলে চিকিৎসক নিচের কয়েকটি টেষ্টের কথাও বলতে পারে-

  • মুত্র পরীক্ষা;
  • কোলেস্টেরল ‍স্ক্রিণিং এবং রক্তের অন্যান্য পরীক্ষা;
  • ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম;
  • হৃৎপিন্ড ও কিডনির আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ইত্যাদি।

এই সব পরীক্ষার মাধ্যমে ডক্টর খুজে বের করতে সমর্থ হন যে, আপনার উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার জন্য দ্বিতীয় কোন ইস্যু দায়ী কিনা। ডক্টর ইহাও দেখতে পারেন যে, উচ্চ রক্তচাপের কারণে আপনার শরীরের অন্যান্য অঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা। এই পর্যায়ে ডক্টর আপনাকে মেডিকেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া শুরু করবে।

রক্তচাপ পরিমাপের ফলাফল কিভাবে তৈরি হয়?

রক্তচাপ পরিমাপের ফলাফল দু’টি সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়, যেমন-

  • সিস্টোলিক প্রেসার: ইহাই হল প্রথম বা উপরের সংখ্যা। যখন হৃদ স্পন্দনের মাধ্যমে হৃৎপিন্ড থেকে রক্ত বেরিয়ে যায় তখন আপনার ধমনীতে প্রবাহমান রক্তের চাপ এই সিস্টোলিক প্রেসার দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
  • ডায়াস্টোলিক প্রেসার: ইহা হল দ্বিতীয় বা নিচের সংখ্যা। ডায়াস্টোলিক প্রেসার দ্বারা বুঝানো হয় যে, আপনার হৃৎপিন্ডের দু’টি স্পন্দনের মধ্যকার সময়ে ধমনীতে প্রবাহিত রক্তের চাপ কত- তা নির্দেশ করা।

একজন প্রাপ্ত বয়স্ক লোকের ক্ষেত্রে রক্তচাপ পরিমাপের ফলাফল পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায় :

  • Healthy: যখন ব্লাড প্রেসার পরিমাপের ফলাফল ১২০/৮০ mmHg থেকে কম হয়।
  • Elevated: যখন সিস্টোলিক প্রেসার ১২০-১২৯ mmHg এর মাঝামাঝি হয় এবং ডায়াস্টোলিক প্রেসার ৮০ mmHg থেকে কম হয়। চিকিৎসকগন সচারাচর এই ধরণের রোগীকে ঔষধ প্রদানের মাধ্যমে ব্যবস্থাপত্র দেন না। বরং, এই ক্ষেত্রে চিকিৎসকগন লাইফ স্টাইল পরিবর্তনের উপর গুরত্ব দিয়ে থাকেন যাতে আপনার রক্ত চাপ পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় নেমে আসে।
  • Stage-1 hypertension : এই ক্ষেত্রে সিস্টোলিক প্রেসার ১৩০-১৩৯ mmHg এর মাঝামাঝি হয় অথবা ডায়াস্টোলিক প্রেসার ৮০-৮৯ mmHg এর মধ্যে হয়।
  • Stage 2 hypertension : সিস্টোলিক প্রেসার ১৪০ mmHg বা তার বেশী হয় বা ডায়াস্টোলিক প্রেসার ৯০ mmHg বা তার বেশী হয়।
  • Hypertensive crisis : এক্ষেত্রে সিস্টোলিক প্রেসার ১৮০ mmHg এর চেয়ে বেশী হয় অথবা ডায়াস্টোলিক প্রেসার ১২০ mmHg এর চেয়ে বেশী হয়। ইহা খুবই ভয়ের কারণ। এই অবস্থার রোগীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। যদি এর সাথে অন্যান্য লক্ষণ যেমন বুকে ব্যাথা, মাথা ব্যাথা, শ্বাস কষ্ট বা চোখে দেখার কোন সমস্য থাকে তাহলে বুঝতে হবে পরিস্থিতি ভাল নয়।

শিশু এবং তরুণদের বেলায় রক্তচাপ পরিমাপের আদর্শ মান ভিন্ন। এক্ষেত্রে আপনি চিৎিসকের সাহায্য নিতে পারেন।

উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা কি?

উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা দেওয়ার আগে ডক্টরকে অনেকগুলো বিষয় মাথায় নিতে হয়। তা হল, আপনি কোন ধরণের হাইপার টেনশনে ভুগছেন এবং এর পিছনে কি কি কারণ সনাক্ত করা হয়েছে।

  • প্রাইমারি হাইপার টেনশনের চিকিৎসা পদ্ধতি:

যদি আপনার প্রাইমারি হাইপার টেনশন ধরা পরে, তাহলে জীবনধারার পরিবর্তন এই অবস্থা দুর করতে সহায়ক ভুমিকা রাখতে পারে। যদি লাইফ স্টাইল পরিবর্তনে উন্নতি না হয় তখন ডক্টর আপনাকে ঔষধ প্রদানের মাধ্যমে চিকিৎসা দিতে পারে।

  • সেকেন্ডারি হাইপার টেনশনের চিকিৎসা পদ্ধতি:

যদি চিকিৎসক আপনার সেকেন্ডারি হাইপার টেনশন হওয়ার কোন কারণ সনাক্ত করতে পারে, তাহলে সেই কারণ দুরীভূত করা হবে প্রধান চিকিৎসা কৌশল। যেমন ধরুন, অন্য কোন ঔষধ সেবনের দ্বারা যদি আপনার রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার প্রমান পাওয়া যায়, তাহলে ডক্টর ঔষধটি পরিবর্তন করে এমন ঔষধ দিতে পারে যার এই ধরণের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থাকেনা। কখনোও কখনোও কারণ অনুযায়ি চিকিৎসা দেওয়া সত্ত্বেও হাইপার টেনশন থেকেই যায়। এই ক্ষেত্রে ডক্টর জীবনধারা পরিবর্তনের সাথে সাথে ঔষধও প্রদান করতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় মেডিকেশন বা ঔষধ প্রদান পদ্ধতিতে মাঝে মাঝে পরিবর্তন আনতে হয়। একই শক্তিসম্পন্ন ঔষধ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে এর কার্যকারিতা কমে যেতে থাকে। এর জন্য আপনার চিকিৎসক সময়ে সময়ে তা পরিবর্তন কিংবা মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারেন।

  • হাই ব্লাড প্রেসার বা উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ:

প্রথম প্রথম অনেক রোগীকে একটি বা দু’টি সংমিশ্রণে ট্রায়াল বেসিসে ঔষধ দেওয়া হয়। কতটুকু সফলতার সাথে কাজ করছে তা দেখার জন্য। আপনার বেলাতেও এমন হতে পারে। যে ঔষধটি আপনার জন্য অধিক কার্যকর হিসাবে পাওয়া যাবে, সেটিকেই আপনার জন্য নির্ধারণ করা হবে। উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসায় যেসব ঔষধ ব্যবহার করা হয়, তারা হল –

  • Beta-blockers:

এদের কাজ হল আপনার হৃদযন্ত্রের স্পন্দন কমিয়ে দেওয়া। এর ফলে প্রতি স্পন্দনে ধমনী দিয়ে তুলনামুলক কম পরিমানে রক্ত চলাচল করে যা রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে। এছাড়াও রক্তচাপ বৃদ্ধিতে কাজ করে শরীরের এমন কিছু হরমনকেও এরা ব্লক করে দেয়।

  • Diuretics:

আপনার শরীরে যদি সোডিয়াম লেভেল বেড়ে যায় এবং অতিরিক্ত ফ্লুইড জমা থাকে তাহলে আপনার রক্তচাপ বেড়ে যাবে। Diuretics যাকে water pills বলা হয় তারা এই ক্ষেত্রে কিডনিকে সহায়তা করে যাতে অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এর ফলে, রক্তস্রোতে বিদ্যমান অতিরিক্ত ফ্লুইডও যখন ইউরিনে চলে যাবে তখন আপনার রক্তচাপ কমে যাওয়া শুরু করবে।

  • ACE inhibitors:

Angiotensin এমন এক ধরণের রাসায়নিক পদার্থ যার কারণে রক্ত নালীর প্রাচীর সরু এবং আটঁশাঁট হয়ে যায়। আপনার শরীরে যাতে অধিক পরিমানে এই ক্যামিকেল তৈরি হতে না পারে এর জন্য ACE inhibitors কাজ করে। ইহা রক্তনালীকে প্রসারিত করার মাধ্যমে রক্তচাপ কমিয়ে দেয়।

  • Angiotensin II receptor blockers (ARBs):

যেখানে ACE inhibitors এর উদ্দেশ্য হল শরীরে যাতে অধিক পরিমানে angiotensin উৎপাদন না হয়, সেখানে ARBs এর কাজ হল শরীরের বিদ্যমান angiotensin যাতে তার সুনির্দিষ্ট receptor এর সাথে binding না হতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা। এর ফলে আপনার রক্তনালী সংকুচিত ও সরু হওয়া থেকে বেচে যায়। ফলে উচ্চ রক্তচাপও কমে যায়।

  • Calcium Channel Blockers:

এই ধরণের ঔষধ আপনার শরীরের কিছু calcium ব্লক করে দেয় যাতে তারা হৃদপিন্ডের কার্ডিয়াক মাংসপেশীতে প্রবেশ করতে না পারে। এর ফলে কম শক্তিসম্পন্ন হৃদস্পন্দন হয় যা রক্তচাপ কমিয়ে দিতে সহায়তা করে। এই মেডিকেশন আপনার শরীরের রক্তনালী প্রসারিত করতেও সহায়তা করে।

  • Alpha-2 agonists:

স্নায়ু উদ্দীপনার কারণে অনেক সময় রক্ত নালী আঁটশাঁট হয়ে যায়। এই ধরণের ঔষধ আপনার শরীরের স্নায়ু উদ্দীপনা পরিবর্তন করে দেয় ফলে রক্ত নালী প্রসারিত হয়ে যায় এবং রক্তচাপও কমে যায়।

উচ্চ রক্তচাপ বিশিষ্ট রোগীর জন্য করণীয় কি?

স্বাস্থ্যসম্মত জীবনধারা মেনে চলার মাধ্যমে আপনি উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে আনতে পারেন। বাড়িতে থেকে আপনি নিচের বিষয়গুলি মেনে চলার চেষ্টা করুন।

  • স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস করা

হৃদপিন্ডের জন্য ভাল এমন খাবার গ্রহণে অভ্যাস করতে পারলে আপনার উচ্চ রক্তচাপ আস্তে আস্তে কমে যাবে। সুন্দর খাদ্য ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করে উচ্চ রক্তচাপ কমিয় আনা আপনার জন্য খুব গুরত্বপূর্ন। যা পরবর্তিতে অনেক জটিলতা থেকে আপনাকে পরিত্রান দিতে পারে। এইসব জটিলতা হতে পারে হৃদরোগ, স্ট্রোক, হার্ট এটাক ইত্যাদি। হৃদপিন্ডের জন্য ভাল এমন কিছু খাবার খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের খাবার অনেকটা ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য তালিকার মত, যেমন-

    • ফলমুল;
    • শাক-সবজি;
    • সম্পুর্ন দানাদার খাবার (whole grain);
    • মৎসজাত আমিষ জাতীয় খাদ্য (lean protein) যেখানে চর্বির পরিমান কম থাকে;
  • দৈহিক কার্যক্রম বাড়িয়ে দেওয়া: আপনি যদি শারীরিকভাবে কর্মক্ষম হন বা নিয়মিত ব্যায়াম কর্মকান্ডে অংশ নিতে পারেন তাহলে আপনার ওজন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে আপনার শরীর মন উভয়ই উৎফুল্ল থাকবে যার ফলে আপনার উপর যে কোন প্রকার stress দুরীকরণসহ রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে ইহা গুরত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। তাছাড়া, নিয়মিত physical exercise করার দ্বারা আপনার হুদযন্ত্রের সার্বিক সুস্থতা বজায় থাকবে।

আপনি প্রতি সপ্তাহে ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরণের শারীরিক ব্যায়াম করার লক্ষ্য স্থির করতে পারেন। যা দৈনিক ৩০ মিনিট করে পাঁচ দিন করলেই হয়ে যায়। তবে, দৈনিক একসাথে ৩০ মিনিটের কম যেন না হয়।

  • ওজন কামানো: আপনি যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী মোটা বা স্থূল আকৃতির হয়ে থাকেন তাহলে পরিমিত স্বাস্থকর খাবার এবং নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করা আপনার জন্য একান্ত অপরিহার্য। যা আপনার উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করবে।
  • চাপ বা টেনশন মোকাবেলা করা: শারীরিক ব্যায়াম হল চাপ মোকাবেলা বা ‍stress management এর একটি কার্যকর উপায়। এছাড়া চাপ মোকাবেলার অন্যান্য পদ্ধতিও রয়েছে, যেমন-
    • মেডিটেশন
    • গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া
    • মাংস পেশী মেসেজ করা
    • ইয়োগা, ইত্যাদি।

এই সবগুলিই হল শরীরের চাপ বা টেনশন কমানোর প্রমানিত পদ্ধতি। পর্যাপ্ত ঘুমানোর সুযোগ গ্রহন করেও আপনি stress কমিয়ে আনতে পারেন।

  • পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন জীবন পদ্ধতি অনুসরণ করা:

আপনি যদি ধুমপায়ি হয়ে থাকেন তাহলে তা দ্রুত পরিহার করুন। এর ধোঁয়ায় যে রাসায়নিক পদার্থ থাকে তার ফলে শরীরের কোষ-কলা ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং রক্ত নালীর প্রাচীর শক্ত করে ফেলে। এছাড়া, আপনি যদি নিয়মিত বেশী পরিমানে মদ্যপানে অভ্যস্ত থাকেন, তাহলে তা পরিহারের চেষ্টা করুন। এলকোহল রক্তচাপ বাড়াতে কাজ করে।

কি কি খাবার উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে?

উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসা এবং প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ উপায় হল খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহন করা। এখানে উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের জন্য বিশেষজ্ঞ কর্তৃক সুপারিশকৃত সবচেয়ে ভাল কয়েকটি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হলো:

  • প্রাণিজ খাদ্য কম খেয়ে উদ্ভিদজাত খাদ্য বেশী খাওয়ার চর্চা করুন:

উদ্ভিদ হতে প্রাপ্ত খাদ্যে আঁশ জাতীয় উপকরণ বেশী থাকে যা প্রাণিজ আমিষের সোডিয়াম ও অন্যান্য সম্পৃক্ত চর্বি কমাতে সহায়তা করে। আপনার খাদ্য তালিকায় ফলমুল, সবুজ শাক-সবজি এবং পূর্ন দানাদার শষ্য খাবার বাড়িয়ে দিন।

  • খাবার লবন যথাসাধ্য কম গ্রহন করুন:

যারা উচ্চ রক্তচাপের রোগী এবং যাদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি রয়েছে তাদের উচিত খাবারের সাথে দৈনিক ১৫০০ মিলিগ্রাম থেকে ২৩০০ মিলিগ্রামের ভিতরে সোডিয়াম বা খাবার লবন গ্রহন করা। খাবার লবন কমানোর সহজ উপায় হলো বার বার টাটকা খাবার তৈরি করা। রেস্টুরেন্ট বা প্যাকেটজাত খাবার পরিহার করুন যেখানে খাবার লবনের পরিমান বরাবরই বেশী পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

  • মিষ্টি জাতীয় খাবার কম খাওয়া:

চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাদ্য ও পানীয় শূন্য ক্যালরি ধারণ করে যেখানে কোন পুষ্টিকর খাদ্য উপাদান থাকেনা। যদি আপনি মিষ্টি পছন্দ করেন, তাহলে আপনি মিষ্টি স্বাদযুক্ত টাটকা ফল খেতে পারেন। তাছাড়া, কম পরিমানে dark Chocolate খেতে পারে যা চিনির মত ততটা মিষ্টি নয়। গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে জানা যায় যে, এই ধরণের চকলেট রক্ত চাপ কমাতে সহায়তা করে।

উচ্চ রক্তচাপ কি কি পরিণতি বয়ে আনতে পারে?

যেহেতু উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপার টেনশন অনেকটা নীরব ঘাতকের মত, ইহা লক্ষণ প্রকাশের পূর্বেই আপনার শরীরে ক্ষতি সাধন করতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ মোকাবেলার জন্য চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ না করার পরিণতি খুব মারাত্মক ও ভয়াভহ এমনকি জীবনহানির কারণও হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা নিম্নরুপ হতে পারে –

  • রক্ত প্রবাহের ধমনী ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া:
  • হৃদপিন্ডের ক্ষতি হওয়:
  • মস্তিষ্কের ক্ষতি সাধন হওয়া;

উচ্চ রক্তচাপ কি প্রতিরোধ করা যায়?

হ্যা, এটি প্রতিরোধযোগ্য। যদি আপনার উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি থাকে তাহলে আপনি নিচের নিয়মগুলি মেনে চলতে পারেন-

  • খাদ্য তালিকার স্বাস্থ্যকর খাবার অন্তর্ভুক্ত করা:
  • শর্করা জাতীয় খাবার কম খাওয়া:
  • দৈহিক ওজন কমানোর একটি লক্ষ্য স্থির করা:
  • নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করা:
  • নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করা: