ডাইং কাকে বলে : ডাইং কত প্রকার, ডাইং মেশিন কত প্রকার ও ডাই কত প্রকার !

ডাইং কাকে বলে- সহজভাবে বলতে গেলে এর উত্তর হল কাপড় রং প্রক্রিয়া। আর কাপড় যে পদার্থ ব্যবাহার করে ডাইং কাজ সমাধা করা হয় তাকে ডাই বলে।

কাপড় আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় একটি পণ্য। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত সবসময়ই কাপড় পরিধান করে আমাদের চলতে হয়।

বাজার থেকে পরনের কাপড় কেনার সময় আমরা অনেক সময় প্রশ্ন করে থাকি। এর রং কি পাকা হবে বা এই কাপড়ের রং উঠবে কিনা। এরকম প্রশ্ন বা আশংকা আমাদের মনে কাজ করে।

আপনি কি জানেন আপনার পছন্দের কাপড়টি কিভাবে রঙ্গিন করা হয়। এর মধ্যে কি কি প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত। এগুলো বুঝতে হলে আপনাকে জানতে হবে – ডাইং কাকে বলে, ডাইং কত প্রকার, কিভাবে কখন কাপড়ে ডাইং করতে হয়, ডাইং প্রক্রিয় সম্পন্ন করতে কি কি ডাই ব্যবহৃত হয়, ডাইং মেশিন কত প্রকার, ডাইং মেশিন কিভাবে কাজ করে?

এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়েই আজকের এই পোষ্ট। চলুন শুরু করা যাক।

তবে, ডাইং বিষয়টি যেহেতু ফেব্রিকের সাথে সম্পর্কিত তাই ফেব্রিক কি ও এর প্রকারভেদ সম্পর্কে  ধারণা থাকা প্রয়োজন। এছাড়া ফেব্রিক কিভাবে তৈরি হয় এসব বিষয়েও একটি সম্যক ধারণা রাখা প্রয়োজন।

যেমন, ফেব্রিক তৈরির প্রধান কাঁচামাল হল টেক্সটাইল ফাইবার যাকে স্পিনিং প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম ইয়ার্ন তৈরি করা হয়। এই ইয়ার্ন দিয়েই পরবর্তিতে নিটিং বা উইভিং পদ্ধতিতে ফেব্রিক তৈরি হয় যাকে গ্রে ফেব্রিক বলে যা ব্যবহার উপযোগি নয়।

এরপর, গ্রে ফেব্রিককে ডাইং, প্রিন্টিংফিনিশিং ইত্যাদি পদ্ধতির মাধ্যমে যেতে হয়। তারপর তা বাজারজাত করা হয়। এবারে চলুন মুল আলোচনায়, ডাইং কাকে বলে এবং এর আনুষঙ্গিক বিষয়াদি।

ডাই কাকে বলে?

ডাই হল এক ধরণের রঙ্গিন পদার্থ যা দিয়ে কাপড় বা কাপড় তৈরির উপাদান রং করা হয়। এই ডাই রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সাবস্ট্রেট বা কাপড়ের উপরিভাগের সাথে বন্ড তৈরির মাধ্যমে কাপড় রং করার কাজ সম্পন্ন করে। এই ডাই আর পিগমেন্ট অনেক সময় একরকম মনে হতে পারে। সেক্ষেত্রে পার্থক্য করার উপায় হল পিগমেন্টের মাধ্যমে রঙ্গিন করার কাজে রাসায়নিক প্রক্রিয়া সম্পাদন হয় না। এছাড়া, ডাই পানিতে দ্রবনীয় কিন্ত পিগমেন্ট পানিতে দ্রবিভূত হয় না।

ডাই সাধারনত: জলীয় দ্রবনে যোগ করা হয়। তবে ডাই এর মাধ্যমে কাপড় রং করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে অনেক সময় Mordant মিশিয়ে নেওয়া হয়।

ডাই মলিকুল আলোক রশ্মি শোষন করে একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘে মানুষের চোখে প্রতিফলন করে। এর ফলে আমাদের চোখ কোন কিছু রঙ্গিন হিসাবে দেখার অনুভুতি প্রাপ্ত হয়।

 

ডাই কত প্রকার, কি কি?

ডাই এর শ্রেণিবিভাগ করার আগে জেনে রাখা ভাল যে ডাই অনেক ধরণের হয়। এর মধ্যে বহুল ব্যবহৃত মাত্র কয়েক প্রকারের ডাই নিয়ে আলোচনা করা হবে।

ডাইকে প্রধানত: দুই ভাগে ভাগ করা হয়।

  • ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক ডাই : এ ধরনের ডাই প্রাকৃতিক উৎস যেমন উদ্ভিদ, প্রাণি এবং খণিজ লবন থেকে তৈরি করা হয়। প্রকৃতিজাত ডাই এর অনেক লম্বা ইতিহাস রয়েছে। তবে, এসব ডাই এখন আর বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহার করা হয় না।
  • সিনথেটিক বা কৃত্রিম ডাই : কৃত্রিমভাবে গবেষণাগারে উৎপাদিত ডাইকে সিনথেটিক ডাই বলা হয়। কৃত্রিম ডাই রাসায়নিক পদার্থের সংমিশ্রণের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। তবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কৃত্রিম ডাই তৈরি করতে যে ধরণের কেমিক্যালস ব্যবহৃত হয় তার উৎস হল পেট্রোলিয়াম বা আলকাতরা জাতীয় পদার্থ।

কিছু কিছু সিনথেটিক ডাই ধাতব পদার্থও ধারন করে থাকে।

 

এবারে, রাসায়নিক বৈশিষ্ট এবং দ্রবনীয়তার উপর ভিত্তি করে ডাই বিভিন্ন প্রকার হতে পারে।

যেমন-

Acid Dye:

এসিড ডাই হল পানিতে দ্রবনীয় এক ধরণের এনায়নিক ডাই কাপড়ের ফাইবার যেমন সিল্ক, উল, নাইলন এবং রুপান্তরিত এক্রিলিক জাতীয় ফাইবারে প্রয়োগ করা হয়। এসিড ডাই প্রধানত: উল এবং অন্যান্য প্রাণিজাত ফাইবারে প্রয়োগ করা হয়। যেহেতু এই পদ্ধতিতে Mordant ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তাই এসিড ডাই কদাচিৎ কটন এবং লিনেন ফাইবারে ব্যবহৃত হয়। রং ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিতে (Washfastness) এই ধরণের ডাই নাইলন ফাইবারে প্রচুর পরিমানে ব্যবহৃত হয়।

Natural Dye :

নেচারাল ডাই ঐ সমস্ত ডাইকে বলা হয় যা উদ্ভিদ, অমেরুদন্ডি প্রাণি এবং খনিজ লবন থেকে তৈরি হয়। বেশীরভাগ নেচারাল ডাই হল Vegetable Dye যা গাছের শিকর, মুল, কান্ড, পাতা প্রভৃতি থেকে তৈরি করা হয়। নেচারাল ডাই এর আরেক বায়োলজিক্যাল উৎস হল ফাঙ্গাস।

প্রাণিজ উসের এই ধরণের ডাই এর উদাহারণ হল Cochineal ও Lac জাতীয় পতঙ্গ, গো-মুত্র, Murex Snail, অক্টোপাস ইত্যাদি।

নেচারাল ডাই নন টক্সিক হওয়ার কারণে ইহা বস্ত্র, খাদ্য, ঔষধ, কসমেটিকস প্রভৃতি শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এই ধরণের ডাই ভারত বর্ষে বহু আগে থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। বিশেষ করে গ্রামীন হস্ত শিল্পে নৈপূণ্যতার জন্য এর ব্যবহার অনেক। তবে এর রং ধরে রাখার জন্য মেটালিক মরডেন্ট ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। পরিবেশের উপর মেটালিক মরডেন্টের প্রভাবও সহনীয় মাত্রায় বিদ্যমান।

Direct or Substantive Dye:

এই ধরনের ডাই পানি দ্রবনীয় এবং সাধারনত: Azo Class ভুক্ত যা নিউট্রাল বা কিছুটা এলকালাইন হয়ে থাকে। এদের সেলুলোজিক ফাইবার যেমন কটন ফাইবারের প্রতি বিশেষ এফিনিটি থাকে।

ডাইরেক্ট ডাই এর কিছু বৈশিষ্ট নিচে দেওয়া হল:

  • এরা পানিতে দ্রবনিয়।
  • এনায়নিক স্বভাবের হয়।
  • ডাইং প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য ইলেক্ট্রোলাইটস এর প্রয়োজন হয়।
  • এলকালাইন বা ক্ষারিয় অবস্থা ডাই প্রক্রিয় নিস্পন্ন হয়।
  • সাধারনত: সেলুলোজিক বা প্রোটিন ফাইবারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
  • দামে তুলনামুলক সস্তা হয়।
  • ডাইরেক্ট ডাই সাধারনত: স্থানীয় বাজারে সস্তা পণ্যে ব্যবহৃত হয়।

ডাইরেক্ট ডাই এর কটন ফাইবারের সাথে উল্লেখযোগ্য মাত্রার এফিনিটির কারণে এদের substantive Dye বলা হয়।

Mordant Dye:

এ ধরণের ডাই এর কার্যকারিতা ত্বরান্তিত করার জন্য Mordant এর প্রয়োজন হয়। Mordant হল এক ধরণের অজৈব পদার্থ যা Dye কে কাপড়ের ফাইবারের সাথে ভালভাবে মিশে যেতে সহয়তা করে। অর্থাৎ, ডাই দিয়ে কাপড় রঙ্গিন করার কাজে সাহায্য করে। Mordant Dye পানি ও আলো থেকে কাপড়ের রং টিকিয়ে রাখার জন্য কাজ করে।

যেহেতু বিভিন্ন প্রকার Mordant এর উপস্থিতি কাপড়ের রং এর পরিবর্তন ঘটায় তাই ডাইং প্রক্রিয়ার আগের উপযুক্ত নির্দিষ্ট Dye এর সাথে উপযুক্ত Mordant নির্বাচন করা অতিশয় গুরত্বপূর্ন।

Vat Dye: এর পানিতে অদ্রবনীয় হয়ে থাকে এবং সরাসরি ডাইং করতে পারেনা। ডেনিম কাপড়ের ক্ষেত্রে এ ধরণের ডাই ব্যবহৃত হয়।

Reactive Dye:

রিএক্টিভ ডাই Chromophore ব্যবহার করে যার Substituent এর মাধ্যমে ডাইং প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ ধরনের ডাই দ্বারা কাজ করার পর কাপড়ের রং টেকসই হয়। সাধারনত: সেলুলোজ ধরণের ফাইবার যেমন কটন, ফ্ল্যাক্স প্রভৃতির ক্ষেত্রে ইহা ব্যবহৃত হয়।

Disperse Dye:

এই ডাই কিছু কিছু ক্ষেত্র ব্যাতিত বেশীরভাগ ক্ষেত্রে পানিতে অদ্রবনীয় থাকে। এরা স্বভাবে নন-আয়োনিক হয় এবং হাইড্রোফোবিক ফাইবারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। এই ডাই প্রধানত: পলিস্টার জাতীয় কাপড়েরর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। তবে, নাইলনের বেলায়েও এর ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

Sulfur Dye:

সালফার ডাই প্রাথমিক পর্যায়ে কটন এবং রেয়ন জাতীয় ফেব্রিকসে ব্যবহার করা হয়। এই ডাই দিয়ে কাপড় রং করলে কাপড়ের রং ধারন ক্ষমতা ভাল থাকে।

Basic Dye or Cationic Dye:

এর পানিতে দ্রবনীয় এবং দ্রবনে রঙ্গিন ক্যাটায়ন হিসাবে ইহা উপস্থিত থেকে কাজ করে। রুপান্তরিত নাইলন ও পলিষ্টার জাতীয় কাপড়ে এদের ব্যবহার করা হয়।

 

ডাইং কাকে বলে?

টেক্সটাইল ফেব্রিকস বা ফাইবারে ডাই বা পিগমেন্ট প্রয়োগের মাধ্যমে কাপড়, সুতা বা ফাইবার রং করার পদ্ধতিকে ডাইং বলা হয়। এমনভাবে রং করার পদ্ধতি অবলম্বন করা যাতে তা টেকসই হয়। অর্থাৎ কাঙ্খিত Color Fastness বিদ্যমান থাকে। ডাইং কাজটি ডাই ও অন্যান্য প্রয়োজনী কেমিক্যালস এর সমন্বয়ে একটি বিশেষ দ্রবনের সাহায্যে সম্পন্ন করা হয়। দ্রবনের ডাই মলিকুলগুলি কাপড়ের ফাইবারের সাথে Absorption, Diffusion এবং Boding প্রক্রিয়ায় পরস্পরের সাথে মিশে যায়। এখানে সময় এবং তাপমাত্রা একটি গুরত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারি ফেক্টর হিসাবে ভূমিকা পালন করে। কি ধরণের ডাই ব্যবহার করা হচ্ছে তার প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে ডাই মলিকুলস এবং ফাইবারের পরস্পর বন্ধন দুর্বল বা শক্তিশালী হতে পারে। প্রিন্টিং এবং ডাইং অনেক সময় একই রকম মনে হতে পারে। তাদের পার্থক্য হল, প্রিন্টিং এর বেলায় একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন কাপড়ের নির্দিষ্ট জাগায় প্রয়োগের মাধ্যমে কাপড়কে সজ্জিত করা হয়। অপরদিকে, ডাইং হল সম্পূর্ণ কাপড়টিকেই সুষমভাবে রঙ্গিন করা হয়।

ডাইং কত প্রকার?

 

ডাইং মেশিন কত প্রকার?

এই স্বল্প পরিসরে সব প্রকারের ডাইং মেশিন বর্ননা করা সম্ভব নয়। এজন্য আমি সংক্ষেপে একটিু ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব। সাধারণত: ডাইং মেশিন চারভাগে বিভক্ত, যেমন

১. ফেব্রিক ডাইং মেশিন: নিচে ফেব্রিক ডাইং মেশিনের নাম ও কিছু বৈশিষ্ট উল্লেখ করা হল-

  • জেট ডাইং মেশিন: এই ধরণের মেশিনের সাহায্যে ফেব্রিক দড়ির মত করে রং করা হয়। ফেব্রিকের এই দড়ি একটি উচ্চ চাপের nozzle এর ভিতর দিয়ে অতিক্রম করানো হয় যেখানে কাপড়ের উপর অবিরাম ভাবে ডাই স্প্রে করা হয়।
  • Winch Dying Machine: এই ক্ষেত্রেও কাপড় দড়ির মত করে ডাইং করা হয়। এখানে মেশিনের winch এর সাহায্যে কাপড়ের দড়ি চলাচল করানো হয় এবং ঘুরানো হয়। এর ফলে তরল ডাই এর সাথে ভালভাবে মিশ্রিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
  • Beam Dying Machine: এই ডাইং মেশিনের beam এর সাহয্যে ডাইং করা হয়।
  • Jigger Dying Machine: এখানে দুইটি রোলার এর সাহয্যে কাপড় ডাইং করা হয়।
  • Solvent Dying Machine: এই ধরণে ডাইং মেশিনের বেলায় ফেব্রিক ড্রামের ভিতর লোড করা হয়। তারপর ড্রাম ঘুরতে থাকে। যারফলে ড্রামে বিদ্যমান ডাই কাপড়ের সাথে ভালভাবে মিশে যেতে পারে।
  • Padded Mangle Dying Machine: এখানে কাপড় রোলার এর সাহায্যে তরল ডাই এর ভিতর দিয়ে ফেব্রিক প্রবেশ করানো হয়।

২. ল্যাব ডাইং মেশিন: নিচে শুধু কয়েকটির নাম উল্লেখ করা হল।

  • IR Beaker Dying Machine
  • Jigger Lab Dying Machine
  • Oscillating Lab Dying Machine

৩. ইয়ার্ন ডাইং মেশিন: উদাহারণস্বরুপ শুধু কয়েকটির নাম উল্লেখ করা হল-

  • Package or Cop or Cheese Dying Machine
  • Hank Dying Machine
  • Warp Dyeing Machine

৪. ফাইবার ডাইং মেশিন: শুধু কয়েকটির নাম নিচে দেওয়া হল-

  • Continuous Loose Stock Dyeing Machine
  • Discontinuous Loose Stock Dyeing Machine

1 thought on “ডাইং কাকে বলে : ডাইং কত প্রকার, ডাইং মেশিন কত প্রকার ও ডাই কত প্রকার !”

  1. You really make it seem so easy with
    your presentation but I find this matter to be really something that
    I think
    I would never understand. It seems too complex and
    very broad for me.
    I am looking forward for your next post, I’ll try
    to get the hang of it!

Comments are closed.