ক্যালরি কি- এক কথায় জবাব হল ক্যালরি শক্তির একক। পুষ্টির ভাষায়, ক্যালরি ঐ শক্তিকে বুঝায় যা আমরা খাদ্য এবং পানিয় গ্রহণের মাধ্যমে পেয়ে থাকে। এই শক্তি দিয়েই আমারা আমাদের দৈনন্দিক কাজ-কর্ম করে থাকি।

এই আর্টিকেলে খাদ্য এবং পানিয়তে যে ক্যালরি থাকে তাই মুলত: আলোচনা করা হবে। ক্যালরি কি, দৈনিক কত ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ প্রয়োজন এবং ক্যালরি কিভাবে গ্রহন করলে শরির স্বাস্থ্যের জন্য উপকার হয়।

ক্যালরি সম্পর্কে একনজরে কিছু তথ্য:

  • মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্য টিকিয়ে রাখার জন্য ক্যালরি প্রয়োজন।
  • মানুষের লিঙ্গ, বয়স, আকার এবং তার কাজ-কর্মের ধরণ ভেদে প্রত্যেকেরই দৈনিক বিভিন্ন পরিমানে ক্যালরি খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়।
  • ফাস্ট-ফুডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশেও প্রায় ১১% ক্যালরি গ্রহণ করা হয় যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
  • উচ্চ শক্তি সম্পন্ন খাদ্যের পুষ্টিমান যদি কম হয় তাহলে তা শূন্য empty ক্যালরি হিসেবে বিবেচিত।

ক্যালরি কি, কাকে বলে?

অধিকাংশ মানুষই ক্যালরিকে শুধু খাদ্য ও পানিয় এর সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে যেকোন জিনিস যা শক্তি ধারণ করে তার ক্যালরি থাকবে। যেমন ১ কেজি কয়লা ৭,০০০,০০০ ধারণ করে।

ক্যালরি কত প্রকার?

ক্যালরি সাধারণত: দুই প্রকার।

  • ছোট ক্যালরি (cal): এই ক্যালরি বলতে – ১ গ্রাম পানির তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নিত করতে যে পরিমান শক্তির প্রয়োজন হয় তাকে বুঝায়।
  • বড় ক্যালরি (Kcal): ১ কিলোগ্রাম পানির তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নিত করতে যে পরিমান শক্তির প্রয়োজন হয় তাকে Kcal বা বড় ক্যালরি বলে। এর আর একটি নাম হল কিলোক্যালরি।

এই বড় এবং ছোট ক্যালরি অনেক সময় সমঅর্থক শব্দে ব্যবহৃত হয় যা বিভ্রান্তিকর। একটি খাদ্য পণ্যের লেবেলিং-এ যে ক্যালরির পরিমান উল্লেখ থাকে তাকে কিলোক্যালরি বুঝানো হয়। যেমন ধরুন- একটি ২৫০ ক্যালরির চকলেট বারে বাস্তবিক অর্থে ২৫০,০০০ ক্যালরি থাকে।

দৈনিক কত ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ প্রয়োজন?

দৈনিক কত ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ প্রয়োজন এর উত্তরে বিশেষজ্ঞ মহলের তথ্যের উপর ভিত্তিতে জানা যায়- একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের জন্য দৈনিক গড়ে ২৭০০ kcal এবং একজন মহিলার জন্য দৈনিক গড়ে ২২০০ kcal প্রয়োজন হয়।

তবে, প্রত্যেকেরই দৈনিক একই পরিমান ক্যালরির দরকার হয়না। যেমন, ব্যক্তি ভেদে আমাদের বিপাকিয় কার্যক্রম বা metabolic activity বিভিন্ন রকম হয় যার ফলে শক্তি ক্ষয়ের মাত্রা মানুষ থেকে মানুষে পার্থক্য হয়। এছাড়াও, কিছু মানুষ অন্য মানুষের তুলনায় শারীরিকভাবে অধিক কর্মমুখর জীবন যাবনে অভ্যস্ত। এজন্য তার অধিক ক্যালরি গ্রহনের দরকার হয়।

দৈনিক কত ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ প্রয়োজন সে অনুযায়ি এর পরিমান কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে –

  • ব্যক্তি বিশেষের সার্বিক স্বাস্থ্য;
  • দৈহিক কাজ-কর্মের পরিমান;
  • পুরুষ না মহিলা অর্থাৎ লিঙ্গ;
  • দৈহিক ওজন;
  • উচ্চতা;
  • দেহের আকৃতি; ইত্যাদির উপর।

ক্যালরির সাথে স্বাস্থ্যগত বিষয়ের সম্পর্ক কি?

পৃথিবীতে বেচে থাকার জন্য আমাদের ক্যালরির প্রয়োজন। ক্যালরি বা শক্তি ছাড়া শরীরের কোষগুলো মারা যায়। হৃদযন্ত্র এবং ফুসফুস তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবেনা। শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও জীবন বাচিয়ে রাখার মৌলিক কাজ-কর্ম সম্পাদানে ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমরা এই শক্তি পানিয় ও খাদ্যের মাধ্যমে পাই।

আপনার শরীর এবং দৈনন্দিন কর্মকান্ডের ধরণ অনুযায়ি দৈনিক যে পরিমান ক্যালরি প্রয়োজন হয়, আপনি যদি সে অনুযায়ি নির্ধারিত পরিমানে পরিমানে খাদ্য গ্রহণ করেন তাহলে আপনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারি হতে পারবেন। নির্ধারিত পরিমানের চেয়ে যদি আপনি খুব বেশী বা কম ক্যালরি গ্রহণ করেন তা অবশেষে আপনার স্বাস্থ্যগত সমস্য তৈরি করবে।

খাদ্যে ক্যালরির সংখ্যা আপনাকে বলে দিবে খাদ্যটি কি পরিমান স্থিতি শক্তি ধারণ করে। কথাটির অর্থ আরোও পরিস্কার করে বলতে গেলে – এখানে শুধু ক্যালরিই গুরত্বপূর্ণ নয় বরং যে পদার্থের মাধ্যমে ক্যালরি নেওয়া হবে সেটিও গুরত্বপূর্ণ।

নিচে তিনটি প্রধান খাদ্য উপাদানের ক্যালরি মান বলা হল-

  • ১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাদ্য ধারণ করে ৪ কিলো ক্যালরি।
  • ১ গ্রাম প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাদ্যে ৪ কিলো ক্যালরি পাওয়া যায়।
  • ১ গ্রাম ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় খাদ্যে থাকে ৪ কিলো ক্যালরি।

একটি উদাহারণের সাহায্যে আরোও পরিস্কার হয়ে যাবে। ধরুন, একটি কাপে কয়েকটি ডিম ভেঙ্গে রাখা হল যার ওজন ২৪৩ গ্রাম। কেউ দৈনিক এই 243 গ্রাম ডিম খেয়ে কি পরিমান ক্যালরি পেতে পারে তার একটি হিসাব দেওয়া হল-

243 গ্রাম ডিমে প্রধান তিনটি খাদ্য উপাদানে ক্যালরির পরিমান নিম্নরুপ হতে পারে-

  • চর্বি: ২৩.১১ গ্রাম;
  • প্রোটিন: ৩০.৫২ গ্রাম;
  • কার্বোহাইড্রেট: ১.৭৫ গ্রাম;

উপরে কিছুক্ষণ আগেই বলা হয়েছে যে এই তিনটি খাদ্যে প্রতি গ্রাম হিসেবে কি পরিমান ক্যালরি ধারণ করে। সে অনুযায়ি হিসেব করে ক্যালরির পরিমান আমরা নিম্নরুপভাবে পেতে পারি।

  • ২৩.১১ গ্রাম চর্বিতে ক্যালরির পরিমান হল ২৩.১১*9 = 207.99 কিলোক্যালরি;
  • ৩০.৫২ গ্রাম প্রোটিনে ক্যালরির পরিমান হল ২৩.১১*৪ = ১২২.০৮ কিলোক্যালরি;
  • ১.৭৫ গ্রাম শর্করায় ক্যালরির পরিমান হল ১.৭৫*৪ = ৭ কিলোক্যালরি;

এবার আমরা বলতে পারি ২৪৩ গ্রাম কাঁচা ডিম মোট  ৩৪৭ কিলোক্যালরি শক্তি ধারণ করে। যেখানে চর্বির অংশ থেকে ২০৮ kcal, প্রোটিনের অংশ থেকে ১২২ kcal এবং শর্করার অংশ থেকে ৭ kcal পাওয়া গিয়েছে।

দিনের কোন সময়ে বেশী খাওয়া উচিত?

দিনের ঐ সময়কেই আপনার বেছে নেওয়া উচিত যখন খেলে আপনার শরীর খাদ্য থেকে প্রাপ্ত ক্যালরিকে সবচেয়ে ফলপ্রসুভাবে কাজে লাগাতে পারে।

Obesity জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, ৭০০ কিলোক্যালরি শক্তি ধারণসম্পন্ন সকালের একটি বড় মাপের নাস্তা হল ওজন কমানোর জন্য একটি আদর্শ খাবার। এর মাধ্যমে আপনি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের ঝুঁকি কমাতে পারেন।

সকালের একটি বড় মাপের নাস্তা আপনার দৈহিক ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখাতে সহায়তা করতে পারে। এই সময়ে আপনি আপনার তৃপ্তি মিটিয়ে খাবার খেলেও কোন সমস্য হওয়ার আশংকা থাকেনা। কারণ দিনের বাকী অংশে আপনার দৈনন্দিক কাজকর্মের দ্বারা এই ক্যালরিকে বার্ন করার জন্য আপনি প্রচুর সময় পাবেন।

Empty ক্যালরি কাকে বলে?

Empty ক্যালরি হল যে সব ক্যালরি এমন ধরণের শক্তির যোগান দেয় যার পুষ্টিমান খুব কম থাকে। যেসব খাদ্য empty ক্যালরি প্রদান করে সেখানে ফাইবার, এমাইনো এসিড, এন্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন, খণিজ লবন ইত্যাদির উপস্থিতি বস্তুত নাই বললেই চলে।

United States Department of Agriculture (USDA) কর্তৃক প্রণীত chooseMyPlate.gov নামের একটি খাদ্য ব্যবস্থাপনা টুল অনুযায়ি, empty ক্যালরি প্রধানত: solid fat বা নিরেট চর্বি এবং যোগ করা সুগার বা added sugar থেকে আসে।

  • Solid fat:

যদিও নিরেট চর্বি প্রকৃতিগতভাবেও অনেক খাদ্যে বিদ্যমান থাকে তথাপি বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে এই ধরণের চর্বি  বাণিজ্যিকভাবে খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করার সময় এবং বিশেষ কিছু খাদ্য প্রস্তুতের সময় ব্যবহার করা হয়। যেমন, butter বা মাখন হল এই ধরণের চর্বির একটি উদাহারণ।

  • Added sugar:

খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ইন্ডাস্ট্রিতে মিস্টি জাতীয় খাদ্য তৈরির সময় এই ধরণের ‍সুগার আলাদাভাবে ব্যবহার করা হয়। সবচেয়ে পরিচিত added sugar এর একটি উদাহারণ হতে পারে সুক্রোজ।

সলিড ফ্যাট এবং এডেড সুগার খাদ্য এবং পানিয়কে অধিক সুস্বাদু করার কাজে প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এই স্বাদ সমৃদ্ধ খাবার আপনাকে অধিক ক্যালরি উপহার দিবে যা পরবর্তিতে ওজন বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাড়ায়।

কোন কোন খাদ্যে Empty ক্যালরি বেশী থাকে?

সলিড ফ্যাট ও এডেড সুগার যে সব খাদ্যে বেশী থাকে-

  • আইসক্রিম;
  • Donuts;
  • Cookies;
  • Pastries;
  • Cakes; ইত্যাদি।

সলিড ফ্যাট যেসব খাদ্যে বেশী থাকে-

  • চিজ;
  • পিজা;
  • সসেজ;
  • হটডগস;
  • রীবস;
  • ব্যাকন;

Added সুগার যেখানে বেশী পাবেন:

  • ফলের জুস;
  • এনার্জি ড্রিংকস;
  • স্পোর্টস ড্রিংকস;
  • সোডা; ইত্যাদি।

মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের একটি তথ্য অনুযায়ি জানা যায়, যুক্তরাস্ট্রের প্রায় অর্ধেক মানুষ দৈনিক কমপক্ষে একটি করে added sugar বিশিষ্ট ড্রিংকস পান করে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা যায় কেউ যদি দৈনিক এক গ্লাসের বেশী এই ‍জাতীয় পানিয় পান করে তাহলে তার উচ্চ রক্তচাপ তৈরি হওয়ার ঝুকি বাড়িয়ে দিবে।

এজন্য, দায়িত্বটি আপনার। খাদ্য পছন্দের সময় কম সলিড ফ্যাট বা কম এডেড সুগার জাতীয় খাদ্য নির্বাচন করুন।

উপসংহার

ক্যালরিকে শুধু দৈহিক ওজন বৃদ্ধির জন্য দায়ি করা যাবেনা। প্রয়োজনমত ক্যালরি আপনার সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। ইহা তখনই কেবল স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয় হবে যখন আপনি প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহন করবেন।

ক্যালরি নিয়ে চিন্তার সময় শুধূ খাদ্য নিয়ে বিবেচনা করাই যথেষ্ট নয়। বরং এর সাথে আপনার শারীরিক পরিশ্রম বা দৈহিক ব্যায়ামের বিষয়টিও বিবেচনায় আনতে হবে। আপনার দৈহিক কার্যক্রমের দ্বারা অতিরিক্ত ক্যালরি বার্ন হয়ে যাবে। ফলে তা চর্বি হিসেবে শরীরে জমে থাকার সুযোগ পাবেনা।