করোনারি আর্টারি রোগ: কেন ও কিভাবে হয়, প্রতিরোধের উপায় কি?

করোনারি আর্টারি রোগ এর অপর নাম করোনারি হার্ট রোগ। যখন করোনারি আর্টারি খুব সরু হয়ে যায় তখন এই রোগ দেখা দেয়। করোনারি আর্টারি হার্টে রক্ত সরবরাহ করে যার ফলে হার্ট অক্সিজেন এবং প্রয়োজনিয় পুষ্টি পেয়ে থাকে। এভাবেই হার্ট সচল থাকে।

করোনারি আর্টারি নামের রোগটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোলেস্টেরলের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যাদের রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমান বেশী তাদের অক্রান্ত হওয়ার সুযোগ অধিক থাকে। এই কোলেস্টেরল করোনারি আর্টারির প্রাচিরে জমা হতে হতে একসময় কোলেস্টেরলের স্তর বা plaque তৈরি করে ফেলে। এর ফলে আর্টারির ভিতরের আয়তন কমে গিয়ে সরু হয়ে যায়। ফলে হার্টে রক্ত সরবরাহের পরিমান কাংখিত মাত্রা থেকে কমে যায়।

অবশেষে হার্টে কম পরিমানে রক্ত প্রবাহের কারণে বুকে ব্যাথার সৃষ্টি হয় যাকে angina বলে। শ্বাস-প্রশ্বাস খাটো বা ছোটো হয়ে যায় এবং অন্যান্য লক্ষণগুলিও প্রকাশ পেয়ে যায়। যখন করোনারি আর্টারি সম্পূর্ণভাবে ব্লক হয়ে যায় তখনই হার্ট অ্যাটাক নামের অবস্থার তৈরি হয়। যা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে।

এই রোগটি তৈরি হতে যেহেতু কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগে তাই প্রাথমিক পর্যায়ে আপনি এটিকে নাও বুঝতে পারেন। যখন হার্টে ব্লক হওয়ার মত পর্যায় চলে আসে তখন রোগটি বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ধরা পরে। এজন্য, এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা দরকার যাতে প্রথম থেকেই আপনি এর প্রতিরোধমুলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। আপনি যদি healthy lifestyle বা স্বাস্থ্যসম্মত জীবন-বিধান মেনে চলেন তাহলে এ থেকে পরিত্রান লাভের একটি বিরাট সুযোগ থেকে যায়।

Coronary Heart Disesease (CHD) রোগটি সারা বিশ্বেই হার্টের খুব কমন ধরণের একটি রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে খোদ যুক্তরাস্ট্রেই প্রতি বছর ৩৭০০০০ জনেরও অধিক মানুষের মৃত্যু হয়।

করোনারি হার্ট রোগের লক্ষণ কি কি?

এই রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে যখন আস্তে আস্তে করোনারি আর্টারি সরু হতে থাকে তখন হার্টে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত সরবরাহ কমে যেতে থাকে। যেহেতু আর্টারির প্রাচিরে ধিরে ধিরে স্তর জমা হয়, তাই প্রথম প্রথম এর লক্ষণ বাহ্যিকভাবে বোঝা যায় না। তবে, পরবর্তিতে এর বিভিন্ন রকমের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে, যেমন-

  • বুকে ব্যথা বা angina: আপনি আপনার বক্ষদেশে এক ধরণের চাপ অনুভব করতে পারেন যেন কেউ আপনার বুকের উপর বসে আছে। এই ধরণের ব্যাথাকে angina বলা হয়। যা সাধারণত: বুকের মধ্যবর্তি স্থানে বা বুকের বামপাশে হয়ে থাকে। ভারি ধরণের কাজ করার পর বা শারিরিক কর্মকান্ড যখন বেশী করা হয় তখন এই ধরণের ব্যাথার অনুভুতি বেড়ে যায়। ভারি কাজ থেকে বিরত হওয়ার কিছু সময় পর ব্যাথা পুনরায় প্রশমিত হয়ে যায়। কোন কোন মানুষের বেলায় বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় তীব্র ব্যথা অনুভূত হয় যা গলা, বাহু বা পিঠের দিকেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
  • শ্বাস-প্রশ্বাস খাটো হয়ে যাওয়া: হার্টে রক্ত সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে হার্ট কার্য ক্ষমতা তথা এর পাম্পিং কাজ ব্যহত হয়। কাংখিত মাত্রায় পাম্পিং করতে পারে না। ফলে, সারা দেহে রক্ত সরবরাহ কমে যায়। এতে করে শ্বাস-প্রশ্বাস ছোট হয়ে যায়।
  • হার্ট অ্যাটাক: করোনারি আর্টারি যখন পুরোপুরিভাবে ব্লক হয়ে যাবে তখন হার্ট অ্যাটাক দেখা দেয়। এর ফলে আপনার বক্ষদেশে বিপর্যয় সৃষ্টির মত এক ধরণের কঠিন চাপ অনুভূত হয় এবং ব্যথা আপনার কাঁধ, হাতের বাহু পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। শ্বাস কষ্ট দেখা দেয়। এক পর্যায়ে শরীর ঘেমে যায়।

মহিলাদের ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় ব্যাতিক্রমি লক্ষণ বেশী দেখা দেয়, যেমন ঘার অথবা চোয়ালে ব্যথা হওয়া। এছাড়াও, তাদের ক্লান্তি, বমি বমি ভাব এবং শ্বাস কষ্ট দেখা দিতে পারে।

কোন কোন ক্ষেত্রে বাহ্যিক কোন লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে।

করোনারি হার্ট রোগের কারণ কি কি?

করোনারি আর্টারি রোগের কারণ হিসাবে ধরা হয় যখন করোনারি আর্টারির ভিতরের প্রাচিরে কোন রকমের আঘাত, ক্ষত বা ইনজুরি হয়। কখনোও কখনোও এটি শৈশব কাল থেকেও দেখা দিতে পারে। করোনারি আর্টারির প্রাচিরে এই ধরণের আঘাত বা ক্ষত বিভিন্ন কারণে হতে পারে, যেমন-

যখন করোনারি আর্টারির ভিতরের প্রাচির ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায় তখন কোলেস্টেরলের চর্বি জমা হয়ে সেখানে plaque বা স্তার তৈরি করে। পরবর্তিতে ওখানে কোষের অন্যান বর্জ্য পদার্থও জমা হতে থাকে। এই পদ্ধতিকে atherosclerosis বলা হয়। এই plaque ভেঙ্গে বা ফেটে গেলে সেটিকে মেরামতের জন্য সেখানে platelets নামক রক্তকনিকা জড়ো হতে থাকে। এর ফলে, এক সময় আর্টারি ব্লক হয়ে যায়, আর তখন হার্ট এটাকের সৃষ্টি হয়।

অনেক ক্ষেত্রে করোনারি আর্টারিতে রক্ত জমাট বেধেঁ যেতে পারে যাকে করোনারি থ্রম্বোসিস বল হয়। যখন জমাট রক্ত করোনারি আর্টারি ব্লক হয়ে যাওয়ার মত বড় আকার ধারণ করে, তখন তা হার্টে রক্ত সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে হার্ট অ্যাটাক এর সৃষ্টি হয়।

চিকিৎসকের পরামর্শ কখন নিবেন?

উপরে উল্লেখিত লক্ষণগুলোর কোন একটি যদি আপনার সাথে মিলে যায় অথবা যদি আপনি মনে করেন হার্ট অ্যাটাকের মত কোন অবস্থা তৈরি হচ্ছে, তাহলে খুব দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন। সম্ভব হলে, দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।

এছাড়া, করোনারি হার্ট রোগের ঝুঁকি যে সব রোগের কারণে বেড়ে যায়, আপনি যদি ঐসব রোগ যেমন হাই কোলেস্টেরল, হাই ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস, ওবেসিটি ইত্যাদি রোগে ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে চিকিৎসকের সাথে নিয়মিত যোগযোগ রক্ষা করে চলুন।

কি কি বিষয় করোনারি হার্ট রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়?

নিচের বিষয়গুলি করোনারি আর্টারি রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে-

  • বয়স: বয়স যত বেশী হবে করোনারি আর্টারির প্রাচির তত বেশী সরু হতে থাকে।
  • সেক্স: মহিলার তুলনার পুরুষের এই রোগের ঝুঁকি বেশী থাকে। তবে, মহিলাদের মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর করোনারি আর্টারি রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • পারিবারিক ইতিহাস: আপনার পরিবারের কারোও যদি এই রোগে হয়ে থাকে, তাহলে আপনার ঝুঁকি বেড়ে যাবে। বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তিটি যদি আপনার নিকট আত্মিয় হয় এবং তার যদি অল্প বয়সে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকে। তবে, আপনার বাবা বা ভাই যদি ৫৫ বয়সের পূর্বে এবং আপনার মা ও বোন যদি ৬৫ বয়সের পূর্বে এই রোগের আক্রান্ত হয়ে থাকে; তাহলে আপনার আক্রান্ত হওয়ার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে।
  • ধুমপান: যারা ধুমপান করে তাদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা তাৎপর্যপূর্ণভাবে বেড়ে যায়। পরোক্ষ ধুমপায়িদের ক্ষেত্রে করোনারি আর্টারি রোগের ঝুঁকি রয়েছে।
  • হাই ব্লাড প্রেসার: অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের কারণে আপনার আর্টারির প্রাচির সরু এবং মোটা হয়ে যেতে পারে। যার ফলে, আর্টারি সরু হয়ে যায় এবং ফলশ্রুতিতে আর্টারির ভিতরের এলাক দিয়ে রক্ত প্রবাহের পরিমান কমে যাবে।
  • হাই ব্লাড কোলেস্টেরল: রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশী হলে আর্টারির প্রাচিরে plaque তৈরির সম্ভাবনা বেড়ে যায় এবং atherosclerosis হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। হাই কোলেস্টেরল কিভাবে ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে তার উপর পৃথক একটি পোষ্টে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
  • ডায়াবেটিস: ডায়াবেটিসের সাথে করোনারি হার্ট রোগের সম্পর্ক রয়েছে। যে সব কারণে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হয়, একই কারণসমুহ করোনারি হার্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। কি কি কারণে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি হয় তার উপর অন্য এক পোস্টে আলোচনা করা হয়েছে।
  • মাত্রাতিরিক্ত দৈহিক ওজন বা ওবেসিটি: দৈহিক ওজন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এই রোগসহ অন্যান্য অনেক রোগের ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
  • শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: আপনি যদি নিয়মিত শরীর চর্চা বা শারীকভাবে সক্রিয় না থেকে সময় অতিবাহিত করেন, তাহলে আপনার করোনারি আর্টারি রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
  • হাই স্ট্রেস: আপনি যদি মানসিক চাপে বা কোন প্রকার টেনশন নিয়ে দু:শ্চিন্তায় জীবন অতিবাহিত করেন তাহলে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
  • অস্বাস্থ্যকর খাদ্য খেলে: অতিরিক্ত মাত্রা সম্পৃক্ত চর্বি, ট্র্যানস ফ্যাট, লবন বা চিনি খেলে করোনারি আর্টারি রোগের ঝুঁকি বেড়ে যাবে।

করোনারি আর্টারি রোগ প্রোতিরোধের উপায় কি?

যে ধরণের লাইফস্টাইল যা করোনারি আর্টারি রোগের চিকিৎসায় উপদেশ দেওয়া হয়, ঐ একই লাইফ স্টাইল অনুসরণের মাধ্যমে এটি প্রোতিরোধও করা যায়। একটি স্বাস্থ্য সম্মত জীবন পদ্ধতি আপনার আর্টারি সচল রাখতে এবং plaque তৈরি না হওয়া থেকে আপনাকে সহায়ত করতে পারে। আপনার হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিচের বিষয়গুলি অনুসরণ করতে পারেন-

 

Reference:

Felman, A., 2021. Coronary heart disease: Causes, symptoms, and treatment. [online] Medicalnewstoday.com. Available at: <https://www.medicalnewstoday.com/articles/184130> [Accessed 20 February 2021].