ডায়াবেটিস এক ধরণের বিপাকীয় (Metabolic) রোগ। সারা বিশ্বে খুবই পরিচিত একটি রোগের নাম। বাংলাদেশেও এই রোগে আক্রান্তের হার অনেক বেশী। এই রোগের অনেক খারাপ দিক রয়েছে- কোন সন্দেহ নেই।

কিন্তু দু’ একটি ভাল দিক যে নেই তা বলা যায়না। যেমন ভাল দিকের মধ্যে একটি এমন হতে পারে যে, আপনার বিসৃঙ্খল, অনিয়ন্ত্রিত ও অগোছালো জীবনকে এই রোগ শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে পারে। আপনার জীবন নিয়মের মধ্যে চালানোর জন্য সহায়ক হতে পারে। আবার, নি:সন্দেহে একটি রোগ হিসেবে এর অনেক খারাপ দিকও রয়েছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও যদি আপনি নিয়ম মেনে না চলেন, তাহলে আপনার জন্য অপেক্ষায় থাকতে পারে খুবই করুণ এক পরিস্থিতি।

যাহোক, এই পোস্টে আমি মুলত: ডায়াবেটিসের ইনস এন্ড আউট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করব। তা হল, ডায়াবেটিস কি, ডায়াবেটিস কেন হয়, ডায়াবেটিসের রিস্ক ফ্যাক্টর কি কি, ডায়াবেটিস কত প্রকার, ডায়াবেটিসের লক্ষণ কি, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর কি কি জটিলতা তৈরি হতে পারে, কিভাবে ডায়াবেটিস রোগ নির্নয় করা যায়, ডায়াবেটিসের চিকিৎসা কি, কিভাবে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায় এবং সবশেষে ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য তালিকা কি হতে পারে ইত্যাদি বিষয়ের উপর তথ্য উপস্থাপন করব।

তাহলে, আর দেরি না করে চলুন শুরু করা যাক:

ডায়াবেটিস কি:

ডায়াবেটিস হল এমন একটি রোগ যা রক্তে গ্লুকোজ প্রক্রিয়াজাতকরণের স্বাভাবিক শারীরিক সামর্থকে কমিয়ে ফেলে বা বাধাগ্রস্থ করে। রক্তে উপস্থিত গ্লুকোজ ইনসুলিনের সহায়তায় কোষে যাওয়ার পর সেখান থেকে বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপন্ন হয় যে শক্তি শরীরের সমস্ত কোষে সরবরাহ হয়। ডায়াবেটিসের ফলে শরীর যেহেতু গ্লুকোজ ব্যবহার করতে অক্ষম সেজন্য গ্লুকোজের এই অব্যবহৃত হিসাবে থেকে যাওয়ার কারণেই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়।

 ডায়াবেটিস কেন হয়:

ডায়াবেটিস কেন হয় এই কারণ বুঝতে হলে প্রথমেই আপনাক জেনে নিতে হবে যে রক্তে গ্লুকোজ কিভাবে পৌঁছে, গ্লুকোজ প্রক্রিয়াজাতকরণের স্বাভাবিক শারীরিক সামর্থ বলতে কি বুঝায়? গ্লুকোজ কি প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবে শরীরে ব্যবহৃত হয়? শরীরে গ্লুকোজ ও ইনসুলিনের পারস্পরিক ভূমিকা কি?

আসুন ডায়াবেটিস কেন হয় তা নিয়ে একে একে আলোচনা করি-

রক্তে গ্লুকোজের উৎস হল, আমরা যে সব খাদ্য খেয়ে থাকি তার মধ্যে শর্করা জাতীয় খাদ্যই হচ্ছে গ্লুকোজের উৎস। শর্করা জাতীয় খাদ্যের কয়েকটি প্রধান উদাহারণ হল- ভাত, রুটি, চিড়া, মুরি প্রভৃতি। এই খাদ্যগুলো খাওয়ার পর পাকস্থলিতে হজম প্রক্রিয়ার শেষে এর সারাংশ অর্থাৎ গ্লুকোজ Small Intestine বা ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রাচীর থেকে শোষিত হয়ে রক্তে পৌঁছে। এভাবে রক্তে প্রতিনিয়ত গ্লুকোজ আসতে থাকে।

অপরদিকে, রক্তে গ্লুকোজ পৌঁছানোর পর থেকেই ইনসুলিন এর ভুমিকা শুরু হয়ে যায়। ইনসুলিন একটি হরমন যা পেনক্রিয়াসের এক প্রকার কোষ থেকে নি:সৃত হয়ে রক্ত প্রবাহে মিশে যায়। রক্তস্রোতে প্রবহিত হওয়ার মাধ্যমে এই ইনসুলিন রক্তে বিদ্যমান গ্লুকোজকে শরীরের কোষে প্রবেশ করতে সহায়তা করে। এইভাবেই, ইনসুলিন রক্তের গ্লুকোজকে কোষে পাঠিয়ে দিয়ে রক্তে গ্লুকোজ এর উপস্থিতি স্বাভাবিক রাখে। রক্তে গ্লুকোজের উপস্থিতি অনুযায়ি পেনক্রিয়াস কর্তৃক প্রয়োজনমত ইনসুলিন সরবরাহ করাই হচ্ছে গ্লুকোজ প্রক্রিয়াজাতকরণের স্বাভাবিক শারীরিক সামর্থ।

এবারে আসুন, গ্লুকোজ কিভাবে শরীরে ব্যবহৃত হয়?

আমরা ইতিমধ্যে এতটুকু জানতে পেলাম যে, ইনসুলিনের মাধ্যমে রক্ত থেকে গ্লুকোজ শরীরের কোষসমুহে পৌছে। গ্লুকোজ কোষে পৌঁছানোর পর একাধিক বায়ো কেমিক্যাল ধাপ অনুসরনের মাধ্যমে বিপাকীয় প্রক্রিয়া সমাপ্তির পর গ্লুকোজ থেকে শক্তি উৎপন্ন হয়।যে শক্তি প্রাপ্তির মাধ্যমে আমরা পার্থিব জীবনে আমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম করে থাকি।

এই ইনসুলিন হরমনটি তৈরি হয় শরীরের অভ্যন্তরের পেনক্রিয়াস এর বিটা সেল থেকে।এখন কোনভাবে যদি পেনক্রিয়াস তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারানোর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিমানে ইনসুলিন তৈরি করতে ব্যর্থ হয় তখন রক্তে আগত গ্লুকোজ প্রক্রিয়াজাত হতে পারেনা। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়। একই সাথে রক্তে গ্লুকোজ অব্যবহৃত হিসাবে থেকে যাওয়ার ফলে শরীরের কোষগুলি স্বাভাবিক শক্তি লাভ করা থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে শরীরে দুর্বলতার সৃষ্টি হয়।

ডায়াবেটিস কত প্রকার:

ডায়াবেটিস কয়েক প্রকারের হতে পারে – যেমন

  • টাইপ -১ ডায়াবেটিস:

এর সঠিক কারণ এখনোও অজানা তবে ধারণা করা হয় যে এটি হল এক প্রকারের অটো-ইমিউন রোগ। যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম পেনক্রিয়াসের ইনসুলিন উৎপাদনকারি কোষকে ধংস করে ফেলে। প্রায় ১০% লোক এই ধরণের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

  • টাইপ -২ ডায়াবেটিস:

এই ধরণের ডায়াবেটিসের বেলায় শরীরের কোষসমুহ ইনসুলিনের প্রতি রেজিস্টেন্ট হয়ে গ্লুকোজ ব্যবহারের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে থাকে। ফলে, রক্ত থেকে গ্লুকোজ কোষে না যেতে পেরে রক্তেই থেকে যায় এবং এভাবে রক্তে সুগার লেভেল বেড়ে যায়। অপরদিকে পেনক্রিয়াসও এই অতিরিক্ত সুগার কোষে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিমানে ইনসুলিন উৎপাদন করতে ব্যহত হয়। এভাবেই টাইপ-২ ডায়াবেটিস তৈরি হয়।

কি কারণে এই ধরণের ডায়াবেটিস হয় তা এখনোও স্পষ্ট নয়। মনে করা হয়, এর পিছনে জেনেটিক এবং পরিবেশগত কারণ থাকতে পারে। শরীরে অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি পাওয়া টাইপ-২ ডায়াবেটিস এর একটি অন্যতম প্রধান কারণ বলে বিবেচিত।

  • প্রি ডায়াবেটিস:

এই প্রকারের ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বল্প মাত্রায় বেড়ে যায় যা চিকিৎসকের নিকট তাৎপর্যপূর্ণ নয়। তবে, এই অবস্থায় অসতর্ক থেকে গেলে, ইহা পরবর্তিতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস তৈরির রাস্তা খুলে দিতে পারে।

  • জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস:

মহিলাদের গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা হরমন নি:সরণ করে থাকে যা অনেক সময় শরীরের কোষকে ইনসুলিন হরমোনের প্রতি রেজিস্টেন্ট করতে পারে।

 

 কি কি বিষয় ডায়াবেটিস আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়:

টাইপ-১ ডায়াবেটিস:

যদিও টাইপ-১ ডায়াবিটিসের সঠিক কারণ জানা যায়নি, তথাপি যে সব ফেক্টর ঝুঁকি বৃদ্ধি করে তা হল-

  • পারিবারিক ইতিহাস:

আপনার ডায়াবেটি আক্রান্তের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে যদি মা-বাবার টাইপ-১ ডায়াবেটিস আক্রান্তের রেকর্ড থাকে।

  • পরিবেশগত বিষয়:

এমন কোন পরিবেশ যেখানে ভাইরাল সংক্রমণের বিষয় জড়িত থাকে যা টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।

  • অটো এন্টিবডির উপস্থিতি যা রোগ প্রতিরোধ সিস্টেমের কোষ ধংস করে:

কখনোও কখনোও টাইপ-১ আক্রান্ত রোগীর পরিবারের সদস্যদের অটোএন্টিবডি উপস্থিতির উপর পরীক্ষা করা হয়। যদি আপনার এরকম কোন অটোএন্টিবডি উপস্থিতি ধরা পরে, তাহলে আপনার টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কিন্তু যাদের শরীরে এই অটোএন্টিবডি পাওয়া যাবে সবাই আক্রান্ত হবে – বিষয়টি এমন নয়।

  • ভৌগলিক বিষয়াদি:

কিছু কিছু দেশ যেমন, ফিনল্যান্ড, সুইডেন প্রভৃতি দেশের বাসিন্দাদের টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশী পাওয়া যায়।

 

টাইপ-২ ডায়াবেটিস:

  • যাদের প্রিডায়াবেটিস থাকে;
  • যাদের দৈহিক ওজন বেশী;
  • পয়তাল্লিশ বা তদুর্ধ বয়স সম্পন্ন মানুষ;
  • উচ্চ রক্তচাপ: যাদের রক্তচাপ ১৪০/৯০ মিলিমিটার মার্কারির বেশী তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসের আক্রান্তের ঝুঁকি বেশী থাকে;
  • অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইড লেভেল: যদি আপনার High Desnsity Liporotein (HDL) এর মাত্রা কম থাকে এবং কোলেস্টেরল বেশী থাকে,
  • সক্রিয়তার অভাব: যদি আপনার শারিরিক কার্যক্রমের সুযোগ কম থাকে। এভাবে শারীরিকভাবে কোন মানুষ যত কম সক্রিয় থাকে, তার টাইপ-২ ডায়াবেটিসের আক্রান্তের সম্ভাবনা তত বেশী হয়;
  • রেস বা ইথনিসিটি: কালো রঙের মানুষ, হিসপ্যানিক, এমেরিকান ইন্ডিয়ান এবং এসিয়ান এমেরিকান মানুষের ঝুঁকি বেশী থাকে;
  • যার পিতামাতা, ভাই বা বোন টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত;
  • যার গর্ভাবস্থায় জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকে অথবা এমন কোন বাচ্চা প্রসব করে যার দৈহিক ওজন ৯ পাউন্ডের বেশী;

গেস্টেশনাল ডায়াবেটিস:

যেকোন গর্ভবতী মহিলার এই প্রকারের ডায়াবেটিস হতে পারে। কিন্তু কোন কোন মহিলার অন্য মহিলার তুলনায় ঝুঁকি বেশী থাকে। রিস্ক ফেক্টরগুলি নিম্নরুপ হতে পারে –

  • বয়স : যেসব মহিলার বয়স ২৫ বছরের বেশী;
  • পারিবারিক বা ব্যক্তিগত ইতিহাস : যদি আপনার প্রিডায়াবেটিস থাকে যা কিনা গেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের অগ্রদুত। এছাড়াও যদি আপনার নিকট আত্মীয় যেমন পিতা-মাতা বা ভাই-বোন টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড থাকে;
  • শারীরিক ওজন: যদি আপনার ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় অধিক হয়
  • রেস বা ইথনিসিটি

 

প্রিডায়াবেটিস:

নিম্নের বিষয়গুলি আপনার প্রিডায়াবেটিসে আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে:

  • দৈহিক ওজন: যদি আপনার শারীরিক ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশী থাকে;
  • বয়স: ৪৫ বা তদুর্ধ বয়স্ক মানুষ;
  • পারিবারিক ইতিহাস: যদি পিতা-মাত বা ভাই-বোনের টাইপ-২ ডায়াবেটিস থাকে;
  • শারীরিক সক্রিয়তা: যদি সপ্তাহে তিন বারের কম শারীরিক ভাবে সক্রিয় থাকে;
  • যার গেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকে;

ডায়াবেটিসের লক্ষণ কি:

ডায়াবেটিসের লক্ষণ নির্ভর করে আপনার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কত বেশী তার উপর। কিছু কিছু মানুষ যারা প্রি-ডায়াবেটিস বা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তারা প্রথম প্রথম এর লক্ষণ নাও বুঝতে পারে। তবে, টাইপ-১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলি তারাতারি প্রকাশ পায় এবং অনেক সময় মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

সাধারণ লক্ষণ:

  • ক্ষুধা বৃদ্ধি;
  • পিপাসা বৃদ্ধি;
  • ওজন কমে যাওয়া;
  • বহুমুত্র বা বার বার Urinate করা;
  • Blurry Vision বা ঝাপসা দেখা;
  • প্রচন্ড অবসাদগ্রস্থতা;
  • ক্ষতস্থান শুকাতে দেরি হওয়া;

পুরুষ ও মহিলার ক্ষেত্রে লক্ষণ:

এই সাধারণ লক্ষণগুলি ছাড়াও পুরুষের ক্ষেত্রে মাংসপেশীর শক্তি কমে যাওয়া একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ। অপরদিকে মহিলাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ইউরিনারি ট্রাক্টে ইনফেকশন দেখা দিতে পারে এবং শরীরের ত্বক উস্ক হয়ে যেতে পারে। ত্বকে চুলকানির লক্ষণও প্রকাশ পেতে পারে।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের লক্ষণ:

  • প্রচুর ক্ষধা লাগা;
  • গলা শুকিয়ে যাওয়া;
  • অনিচ্ছাকৃতভাবে ওজন কমে যাওয়া;
  • বার বার প্রস্রাব করা;
  • কোন কিছু পরিস্কারভাবে দেখতে না পাওয়া;
  • ক্লান্তি অনুভব করা;

টাইপ-২ ডায়াবেটিসের লক্ষণ:

টাইপ-১ এর লক্ষণের মতই। এছাড়াও –

  • ক্ষতস্থান শুকাতে দেরি হয়;
  • বার বার সংক্রমণের স্বীকার হওয়া;
  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া;
  • শরীরে শক্তি না পাওয়া;

জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের লক্ষণ:

অধিকাংশ মহিলার ক্ষেত্রে প্রকার ডায়াবেটিসের কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না। যখন নিয়মিত ব্লাড সুগার টেস্ট করা হয় তখন ধরা পরে বিশেষ করে গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে। বিরল ক্ষেত্রে কোন কোন মহিলা পানির পিপাসা বা বহুমুত্রতার লক্ষণের অভিজ্ঞতা পেতে পারে।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর কি কি জটিলতা তৈরি হতে পারে:

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর জটিলতা ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে। আপনি যদি দীর্ঘ দিন যাবত ডায়াবেটিসে ভুগেন এবং আপনার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হন তাহলে আপনার শারীরিক জটিলতা সৃষ্টির আশংকা বেড়ে যাবে। অবশেষে আপনার মৃত্যুও হয়ে যেতে পারে।

সম্ভাব্য জটিলতা নিম্নরুপ –

  • হৃদরোগ: ডায়াবেটিস নাটকিয়ভাবে বিভিন্ন ধরণের হৃদরোগের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যেমন করোনারি আর্টারিতে সমস্যা ‍সৃষ্টির মাধ্যমে বুকে ব্যথা লাগা (Angina), হৃদ যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া, স্ট্রোক, রক্ত নালী সরু হয়ে যাওয়া (Atherosclerosis) ইত্যাদি।
  • স্নায়ু কোষ ধংস হওয় (Neuropathy): রক্তে অতিরিক্ত মাত্রায় সুগারের উপস্থিতি আপনার শরীরের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র রক্তনালীর (Capillaries) প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্থ করে। যারা স্নায়ু কোষগুলিকে বাচিয়ে রাখার জন্য পুষ্টির যোগান দিয়ে থাকে। বিশেষ করে পায়ের ক্ষেত্রে এই লক্ষণ প্রথমেই প্রকাশ পায় যার ফলে পায়ের আঙ্গুলে ব্যথা অনুভূত হয়। এভাবে আস্তে আস্তে পুরা শরীরের স্নায়ু কোষ দুর্বল হতে থাকে। শরীরের একেক অঙ্গের নিয়ন্ত্রণকারি স্নায়ু যখন তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন ঐ অঙ্গে সঠিকভাবে কাজ করতে পারেনা। Dysfuntion শুরু হয়ে যায়।
  • বৃক্ক বা kidney damage (Nephropathy): কিডনিতে খুবই ছোট ছোট অনেক রক্ত নালী থাকে যাদের Glomeruli বলে। এর কাজ হল রক্ত ফিল্টার করে পরিস্কার রাখা। ডায়াবেটিসের ফলে রক্তের অব্যবহৃত সুগার কিডনির ঐ ফিল্টারিং সিস্টেমকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। এক পর্যায়ে এর কারণে Kidney Damage হয়ে যায়।
  • চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়া (Retinopathy): ডায়াবেটিস রেনিটার রক্ত নালীর ক্ষতি করে যা কোন এক সময় অন্ধত্ব ডেকে আনতে পারে। ডায়াবেটিস চোখের অন্যান্য রোগ যেমন Cataracts এবং Glucoma তৈরিতে Risk factor হিসাবে কাজ করতে পারে।
  • পা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া (Foot Damage);
  • ত্বকের সমস্যা: ডায়াবেটিসের ফলে আপনার শরীরের ত্বকে সমস্যা তৈরি হতে পারে যা পবে বেক্টেরিয়া ও ফাঙ্গাল সংক্রমণের দুয়ার খুলে দিতে পারে।
  • কানে শুনার শক্তি হ্রাস পাওয়া (Hearing Impairment);

কিভাবে ডায়াবেটিস রোগ নির্নয় করা যায়:

ডায়াবেটিস রোগ নির্নয়ের জন্য নিচের টেষ্টগুলি করা হয় –

  • উপবাস অবস্থায় Plasma Glucose Test
  • মুখের ভিতর Glucose Tolerance Test
  • দৈবচয়নের ভিত্তিতে Plasma GLucose Test

ডায়াবেটিসের চিকিৎসা কি:

আপনি ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন ডায়াবেটিস রোগ সম্পর্কে অনেক কিছু। এই রোগ অনেক কঠিন অবস্থা তৈরি করতে পারে যদি সঠিক চিকিৎসা না নেওয়া হয়। এই রোগ সম্পর্কে অনেকটা জেনে গেলেও চিকিৎসার জন্য আপনাকে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বরণাপন্ন হতে হবে। কারণ রোগটি খুব জটিল প্রকৃতির। শুধু তাই নয়, এর সাথে আরোও অন্যান্য রোগের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

যেকোন রোগের চিকিৎসা তার কারণের উপর নির্ভর করে। রোগের সঠিক কারণ চিহ্নিত হয়ে গেলে ঐ কারণ দুরিভূত করার পদ্ধতিকেই চিকিৎসা বলে। কোন রোগের একাধিক কারণ থাকতে পারে। ডায়াবেটিসের বেলায় আমরা জেনেছি যে রোগটি চার প্রকারের। যা ডায়াবেটিস কেন হয় সেই কারণের ভিত্তিতেই শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে।

এখন ল্যাব টেষ্টের মাধ্যমে যার যে ধরণের ডায়াবেটিস সনাক্ত হয় এবং ঐ টাইপের ডায়াবেটিস কি কারণে হয় তার উপর ভিত্তি করেই চিকিৎসা দেওয়া হয়।

তবে, ডায়াবেটিস চিকিৎসার আসল লক্ষ্য উদ্দেশ্যই হল রক্তে সুগারের মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসা এবং তা ধরে রাখা।

তাহলে আসুন আলোচনা করি প্রকারভেদ অনুযায়ি ডায়াবেটিসের চিকিৎসা –

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা:

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের প্রধান চিকিৎসাই হল ইনসুলিন নেওয়। কারণ, এই ধরণের ডায়াবেটিসের বেলায় শরীরের পেনক্রিয়াস ইনসুলিন তৈরির সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ইন্জেকশনের মাধ্যমে গৃহিত কৃত্রিম এই ইনসুলিন প্রাকৃতিক ইনসুলিনের চাহিদা পূরণ করে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে।

সচারাচর চার ধরণের ইনসুলিন বাজারে পাওয়া যায়। শরীরে প্রবেশের পর কত তারাতারি তা কাজ শুরু করে এবং কতক্ষণ বলবৎ থাকে তার উপর ভিত্তি করে ইনসুলিনের এই শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে।

  • প্রথমত: Rapid-acting Insulin, যা শরীরে প্রবেশের ১৫ মিনিটের মধ্যে কাজ শুরু করে ৩-৪ ঘন্টা মেয়াদে কাজ করে।
  • দ্বিতীয়ত: Short-acting Insulin – ইহা শরীরে প্রবেশের ৩০ মিনিটের মধ্যে কাজ শুরু করে ৬-৮ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করে।
  • তৃতীয়ত: Intermediate-acting Insulin – ইহা শরীরে প্রবেশের ১-২ ঘন্টার মধ্যে কাজ শুরু করে ১২-১৮ ঘন্টা পর্যন্ত এর ক্রিয়া থাকে।
  • চতুর্থত: Long-acting Insulin – ইহা শরীরে প্রবেশের কয়েক ঘন্টা পর কাজ শুরু করে এবং ২৪ ঘন্টারও অধিক সময় পর্যন্ত এর কার্যক্রম বলবৎ থাকে।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা:

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং শারীরিক ব্যায়াম এই দু’টির মাধ্যমে অনেকে এ ধরণের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। কিন্তু ডায়েটিং এবং নিয়মিত ব্যায়াম সত্ত্বেও যাদের ব্লাড সুগার স্বাভাবিক হয়না তাদের জন্য ঔষধের প্রয়োজন।

যে উদ্দেশ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মেডিকেশনের প্রয়োজন হয়:

  • পেনক্রিয়াস থেকে ইনসুলিন আউটপুট বৃদ্ধি করা;
  • লিভার থেকে গ্লুকোজ সরবরাহ কমিয়ে দেয়া;
  • ইনসুলিনের প্রতি শরীরের কোষের সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে দেওয়া;
  • ক্ষুদ্রান্ত থেকে শর্করা জাতীয় খাদ্যের শোষনের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া;

যেসব ঔষধের সাহায্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস চিকিৎসা করা হয় –

  • Metformin- যকৃত থেকে গ্লুকোজ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া;
  • Sulfonylureas- অধিক ইনসুলিন নিঃসরণের জন্য পেনক্রিয়াসকে ‍উদ্দীপিত করে;
  • Meglitinides – বেশী পরিমানে ইনসুলিন সরবরাহের জন্য পেনক্রিয়াসকে উদ্দীপীত করে;
  • Thiazolidinediones – ইনসুলিনকে ভালভাবে কাজ করতে সহায়তা করে;
  • DPP-4 Inhibitors – রক্তে সুগারের মাত্রা খুব না কমিয়ে স্বাভাবিক রাখে;
  • SGLT 2 Inhibitors – মুত্রে অধিক পরিমানে গ্লুকোজ পাঠায়;

জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের চিকিৎসা:

গর্ভকালীন সময়ে রক্তে সুগারের মাত্রা দিনে একাধিকবার মনিটর করতে হবে। যদি ব্লাড সুগার বেশী পাওয়া যায় তাহলে ব্যায়াম ও খাদ্যাভাসের পরিবর্ত করতে হবে। এতেও যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না আসে তাহলে ইনসুলিন নিতে হবে।

গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রায় ১০-২০% মহিলা যারা জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাদের রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে ইনসুলিনের প্রয়োজন হয়। তবে, ইনসুলিন গর্ভাবস্থায় ব্যবহারের জন্য নিরাপদ।

প্রি-ডায়াবেটিসের চিকিৎসা:

এই ধরনের ডায়াবেটিসে কোন মেডিকেশনের প্রয়োজন হয়না। শুধু হিসেব করে খাওয় এবং নিয়মিত ৩০-৪৫ মিনিট ব্যায়াম করলেই হল।

কিভাবে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায়:

ডায়াবেটিস হল একটি ক্রোনিক বা দীর্ঘ মেয়দি রোগ। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী যদি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় তাহলে অনেক বড় বড় জটিলতার সৃষ্টি হয়। ডায়াবেটিস সনাক্তের পূর্বে একটি সময় থাকে যখন রক্তে সুগারের মাত্রা বেশী পাওয়া যায় তত বেশী নয় যা ডায়াবেটিস রোগ ডায়াগনোসিসের জন্য যথেষ্ট। আমরা ইতোমধ্যে জেনে গিয়েছি যে, রোগীর এই অবস্থাকে বলে প্রিডায়াবেটিস।

গবেষণা থেকে জানা যায় যে, এরকম প্রিডায়াবেটিস অবস্থার ৭০% মানুষের টাইপ-২ ডায়াবেটিস দেখা দেয়। সুখবর হল – প্রিডায়াবেটিস থেকে ডায়াবেটিসে উন্নিত হওয়া অনিবার্য নয়।

যদিও অনেক বিষয় থাকে যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেমন বয়স্ক হয়ে যাওয়া, জেনেটিক ইস্যু, অতীত আচরণ, তথাপি অনেক বিষয় আমাদের হাতে রয়েছে যা অনুসরণের মাধ্যমে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আমরা কমিয়ে আনতে পারি।

যেভাবে আপনি ডায়াবেটিসকে প্রতিরোধ করতে পারেন –

  • আপনার খাদ্য তালিকা থেকে চিনি এবং পরিশোধিত শর্করা (Refined Carbs) কেটে ফেলুন। পরিশোধিত শর্করা হল যে শর্করা জাতীয় খাদ্যে যেখানের ফাইবারের উপস্থিতি কম থাকে যেমন- সাদা আটা, ময়দা এবং এদের থেকে উৎপাদিত খাদ্য পণ্য। এই জাতীয় খাদ্য খুব সহজেই হজমের পর রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। অপর একটি পোষ্টে ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য কেমন হওয়া উচিত তার উপর বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
  • নিয়মিত শারীরিক কর্মকান্ডে অংশ নিন যা ডায়াবেটিস প্রতিরোধে খুবই কার্যকর। ব্যায়াম করার দ্বারা আপনার শরীরের কোষগুলিকে ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে আপনার রক্তে সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কম পরিমানে ইনসুলিনের প্রয়োজন হয়।
  • প্রধান পানিয় হিসাবে পানি বেছে নিন এবং প্রচুর পরিমানে পান করুন। সুগার মিশ্রিত পানিয় পুরোপুরি পরিহার করুন।
  • আপনার শারীরিক ওজন যদি মাত্রাতিরিক্ত হয় তাহলে দ্রুত ওজন কমানোর জন্য দৈনিক কত ক্যালরি খাদ্য গ্রহন প্রয়োজন– সে অনুযায়ি খাদ্যাভ্যাস তৈরি করুন। তা না হলে আপনার আভ্যন্তরীন অংগ বিশেষ করে লিভারে চর্বির পরিমান বাড়িয়ে দিবে যা বিভিন্ন রকমের প্রদাহ এবং ইনসুলিনের প্রতি রেজিস্টেন্স এর কারণ হতে পারে।
  • আপনি ধুমপায়ি হলে ধুমপান পরিহার করুন।
  • খুব কম পরিমানে শর্করা জাতীয় খাদ্য গ্রহন করুন।
  • এক সাথে বেশী পরিমানে খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস পরিহার করুন।
  • বেশী সময় ধরে শুয়ে-বসে না থেকে মাঝে মাঝে হাটা-চালা করুন। একসাথে বেশী সময় ধরে আসীন হয়ে কাজ না করে মাঝে মধ্যে হাটার অভ্যাস করুন। প্রয়োজনে নিজের ঘরে বা অফিসের ভিতরেই কিছু সময় হাটুন।
  • ফাইবার বা আঁশ সমৃদ্ধ খাবার বেশী করে খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভক্ত করুন।
  • প্রয়োজন মাফিক ভিটামিন ডি গ্রহন করুন। ব্লাড-সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভিটামিন-ডি গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • প্রক্রিয়াজাত বা প্যাকেটজাত খাবার পরিহার করুন।