পেয়ারা: আসুন জেনে নেই এর উপকারিতা!

পেয়ারা বা গুয়াবা হচ্ছে স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত একাধিক অবস্থার ঐতিহ্যবাহী প্রতিকার।গবেষণা থেকে জানা যায় যে, পেয়ারা ফল এবং পাতার অনেকগুলি উপকারিতা আছে। পেয়ারা হলুদ-সবুজ ত্বকের গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফল এবং এগুলো মধ্য আমেরিকার গাছগুলোতে বেড়ে ওঠে। সাধারণ পেয়ারা গাছের লেটিন নাম Psidium guajava. 

ভারত ও চীন সহ বেশ কয়েকটি দেশে মানুষ ডায়রিয়ার নিরাময়ের জন্য পেয়ারা পাতার চা ব্যবহার করে থাকে।অন্যান্য দেশে যেমন মেক্সিকোতে লোকেরা ঐতিহ্যগতভাবে ক্ষত নিরাময়ের জন্য ফলের ভেতরের মাংসল অংশটি ব্যবহার করে থাকেন।

এই পোস্টে ,আমরা পেয়ারার কিছু স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সম্ভাবনাসূচক বা কার্যকর  সুবিধা এবং পেয়ারার ব্যবহার নিয়ে জানতে পারব।এছাড়াও আমরা এখানে পেয়ারার পুষ্টির তথ্য,এর ঝুঁকি এবং খাদ্যতালিকায় পেয়ারা কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায় তার বর্ণনা করার চেষ্টা করব।

চলুন শুরু করি।

পেয়ারায় পুষ্টিগুন 

পেয়ারা ফল একটি পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যকর খাবার যা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (USDA) এর তথ্য অনুযায়ী,১০০ গ্রাম কাঁচা পেয়ারা ফলের মধ্যে রয়েছে:

  • ৬৮ ক্যালোরি;
  • ১৪.৩২ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট;
  • ৮.৯২ গ্রাম শর্করা;
  • ০.৯৫ গ্রাম চর্বি;
  • ডায়েটারি ফাইবার ৫.৪ গ্রাম;
  • ৪১৭ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম;
  • ২২৮.৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি;
  • ৬২৪ আন্তর্জাতিক ইউনিটের ভিটামিন-এ;

পেয়ারার উপকারিতা

টাইপ-২ ডায়াবেটিস

পেয়ারা পাতার চা রক্তে চিনির স্পাইক প্রতিরোধ করতে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের লক্ষণগুলি কমাতে সাহায্য করে।  ২০১০ সালে একটি ক্লিনিকাল ট্রায়ালে এবং প্রাণী গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য সমূহ পর্যালোচনা করে জানা গেছে যে, পেয়ারা পাতার চা ইনসুলিন রেজিস্টেন্সের বিরুদ্ধে কাজ করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা কমিয়ে আনতে সহায়তা করে থাকে।

এই সকল সুবিধার ফলস্বরূপ,পেয়ারা পাতার মিশ্রণ বা নির্যাস কৃত খাবার খাওয়ার পরে গ্লুকোজের শোষণকে মাঝারি পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সহায়তা করে থাকে।

মাসিকের বাধা (Menstrual Cramps)

পেয়ারা পাতার নির্যাসযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করলে তা মাসিকের ব্যাথা কমাতে পারে। ২০০৭ সালের একটি গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায় যে, পেয়ারা পাতার নির্যাসের উপকরণসমুহ যাদের প্রাথমিক ডিসমেনোরিয়া (dysmenorrhea) আছে এমন মহিলাদের মাসিক ব্যথা উপশম করতে পারে।

এই গবেষণায় অংশগ্রহনকারীরা যারা প্রতিদিন পেয়ারা পাতার নির্যাস থেকে ৬ মিলিগ্রাম করে গ্রহণ করেছেন, তারা আইবুপ্রোফেন বা প্লাসবো গ্রহণকারীদের থেকে তুলনামূলকভাবে মাসিকের ব্যথা কম পান।

ডায়রিয়া

পেয়ারা পাতার চা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ডায়রিয়ার জন্য একটি কার্যকর প্রতিকার। প্রাণীর উপর পরিচালিত এক গবেষণা থেকে বোঝা যায় যে, সংক্রামক ডায়রিয়ার চিকিৎসার ক্ষেত্রে পেয়ারা পাতার নির্যাস সমূহ একটি ভাল সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে পারে।

২০১৫ সালে করা অপন একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, সংক্রামক ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে ইদুরের উপর এই নির্যাসটির ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। গবেষকগন লক্ষ করেছেন যে,পেয়ারা পাতার নির্যাস এই রোগের চিকিৎসা হিসাবে ভাল এক বিকল্প হতে পারে।

২০১৫ সালে করা অন্য এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, পেয়ারা পাতার নির্যাস Escherichia coli (E. Coli) আক্রান্ত মুরগির ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

যাই হোক,মানুষের মধ্যে এই ধরনের আবিষ্কারগুলি নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানীদের আরও গবেষণা করা দরকার।

ফ্লু প্রতিরোধে

পেয়ারা পাতার চা পান করলে তা মানুষকে ফ্লু প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।

২০১২ সালের টেস্ট টিউব স্টাডি থেকে জানা যায়,পেয়ারা পাতার চা ফ্লুর চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিভাইরাল এজেন্ট হিসাবে প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছিল। গবেষকরা দেখতে পেয়েছিলেন যে,পেয়ারা পাতার চা টি ভাইরাসগুলির বৃদ্ধিতে বাধা দেয় যা ফ্লু সৃষ্টি করে।

চায়ের অ্যান্টিভাইরাল প্রভাবের ফলে পাতার ফ্ল্যাভ্যানল গুলি হতে পারে যা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে কাজ করে।

মানুষের মধ্যে এই প্রভাবগুলি নিশ্চিত করতে হলে আরও গবেষণার প্রয়োজন হবে।

রক্তচাপ

পেয়ারা পাতার নির্যাস গ্রহণের ফলে তা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। ২০১৬ সালের একটি টেস্ট টিউব সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ইঁদুরের টিস্যুগুলিতে এক্সট্রাক্টটির মধ্যে একটি অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ প্রভাব ছিল, যার অর্থ হলো এটির রক্তচাপ হ্রাস করার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

এই প্রভাবটি পাতার নির্যাসের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর বৈশিষ্ট্যের কারণেও হতে পারে।অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টগুলি রক্তচাপ কমিয়ে রক্তনালীগুলিকে প্রসারিত করতে সহায়তা করে।

তবে বিজ্ঞানীদের পেয়ারা পাতার নির্যাস মানুষের উচ্চ রক্তচাপকে হ্রাস করতে পারে কিনা তা নির্ধারণের জন্য  আরও গবেষণা করা প্রয়োজন।

 

অস্টিওআর্থারাইটিস (Osteoarthritis)

কিছু প্রাণী গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায় যে,পেয়ারা পাতার নির্যাস অস্টিওআর্থারাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উপকার করতে পারে। ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় পাওয়া গেছে যে,উত্তেজিত অস্টিওআর্থারাইটিস সহ ইঁদুরগুলিতে কারটিলেজ ধ্বংসের বিরুদ্ধে নির্যাস সুরক্ষা গ্রহণের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।তবে গবেষকরা এখনও মানুষের মধ্যে এই প্রভাবটি নিশ্চিত করতে পারেননি।

ক্যান্সার

পেয়ারা পাতার নির্যাস  ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ২০১৪ সালে করা টেস্ট টিউব, প্রাণী এবং কম্পিউটার গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায় যে,নির্যাস বা নিষ্কাশনের যৌগগুলি ক্যান্সারের কোষগুলোর বৃদ্ধিকে বাধা দিতে পারে।

তাছাড়া গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে,প্রভাবটি ঘটতে পারার কারণ পেয়ারা পাতার মিশ্রণগুলি সিলেকটিভ ইস্ট্রোজেন রিসেপ্টর মডিউলেটরের (SERMs) মতো কাজ করে। SERMs হলো এক ধরনের ওষুধ যা ডাক্তাররা ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করেন। এগুলি ক্যান্সার কোষকে বহুগুণে না হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।

তবে বিজ্ঞানীদের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এই যৌগগুলির সম্ভাব্যতা আরও ভালভাবে বুঝতে মানবদেহে ক্লিনিকাল ট্রায়াল করা দরকার।

প্রতিকূল প্রভাব এবং ঝুঁকি

 ২০১৭ সালের পেয়ারা নিয়ে গবেষণার রিভিউ তে, পেয়ারা ফল খাওয়া,পেয়ারা পাতার চা খাওয়া বা পেয়ারা পাতার নির্যাস সম্পূরক গ্রহণ করা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো  প্রতিকূল প্রভাব তুলে ধরা হয় নি। তবে সম্ভাবনা বাতিল করার জন্য মতো তেমন কোনো প্রমাণ নেই। কোন প্রতিকার বা সম্পূরক এর যদি খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA)- এর অনুমোদন না থাকে সেক্ষেত্রে প্রতিকূল প্রভাব ফেলতে পারে।

যারা গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়ান তাদের পেয়ারা পাতার নির্যাস গ্রহণের আগে চিকিৎসকের থেকে পরামর্শ নেয়া উচিত।

এই নির্যাস ওষুধের সাথে যোগাযোগ করতে পারে কিনা তা এখনো পরিষ্কার নয়। চলমান কোনো প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে ওষুধ ব্যবহার করে থাকলে,সেক্ষেত্রে যে কোনও নতুন প্রতিকারের চেষ্টা করার আগে একজন ডাক্তারের সাথে কথা বলা উচিত।

পেয়ারা কীভাবে খাবেন

কিছু লোক এমনিতে এমনিতে বা দই দিয়ে কাটা পেয়ারা খেতে পছন্দ করেন।আর অন্যরা এই ফলটি স্মুদি -তে  বা সিদ্ধ পানিতে পেয়ারা পাতা যুক্ত করে এক ধরনের হারবাল বা ভেষজ চা তৈরি করেন।

পেয়ারা জন্য কিছু রেসিপির ধারণা নিচে দেয়া হলোঃ

  • মশলাদার পেয়ারা সিরাপ সাথে বুইনিওলস (buñuelos)
  • কলা পেয়ারা স্মুদি
  • পেয়ারা এবং মিষ্টি পনির ক্রেপস

পেয়ারার পরিপূরক ব্যবহার

অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্র খাদ্যতালিকাগত পরিপূরক বিক্রি করে যাতে পেয়ারা পাতার নির্যাস থাকে।কোনও ব্যক্তি সাধারণত এগুলি প্রতিদিন গ্রহণ করে তবে সেক্ষেত্রে  নির্মাতার নির্দেশ অনুসরণ করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন কোনো ডায়েটরি পরিপূরক গ্রহণের আগে ডাক্তারের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেওয়া হয়, বিশেষত যখন কোনও একটি নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যের সমস্যার জন্য চিকিৎসা করার চেষ্টা করা হয়।

অনলাইনে বিভিন্ন পেয়ারা ডায়েটরি পরিপূরক কিনতে পাওয়া যায়।

সারসংক্ষেপ

পেয়ারা হলো বিভিন্ন ব্যাধির ঐতিহ্যবাহী প্রতিকার। প্রাথমিক গবেষণায় সুপারিশ করা হয় যে, পেয়ারা পাতার নির্যাসের যৌগগুলি মাসিক, ডায়রিয়া, ফ্লু, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সার সহ বিভিন্ন অসুস্থতা এবং লক্ষণগুলির উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অবশেষে, বিজ্ঞানীদের এই গবেষণাগুলি নিশ্চিত করতে এবং আরো ভালোভাবে বোঝার জন্য মানুষের উপর আরো গবেষণা করা দরকার।

 

1 thought on “পেয়ারা: আসুন জেনে নেই এর উপকারিতা!”

Comments are closed.