আখরোট কি: আখরোটের উপকারিতা ও পুষ্টিগুন কেমন?

আখরোট কি, এর পুষ্টিগুন কেমন, আখরোট এর উপকারিতা – বিষয়গুলি নিয়ে তথ্য শেয়ার করার জন্য লেখা শুরু করলাম। আখরোটের নাম নিশ্চয়ই আপনারা শুনে থাকবেন। আখরোট এর উপকারিতা ও পুষ্টিগুন অনেক।

তাহলে, চলুন – কথা না বাড়িয়ে চলে যাই মুল আলোচনায়।

আখরোট কি?

আখরোট এক প্রকার বাদাম যাকে ইংরেজিতে walluts বলা হয়। এটি Juglans গোত্রীয় উদ্ভিদ। এই গোত্রের যে কোন উদ্ভিদ থেকে বাদাম উৎপন্ন হয়। তবে, যে প্রজাতির গাছ আখরোটের জন্য খুব পরিচিত তার বৈজ্ঞানিক নাম  Juglans regia.  আখরোট এমন ধরণের বাদাম যেখানে ৬৫% চর্বি এবং ১৫% প্রোটিন থাকে। এখানে কার্বোহাইড্রেটের পরিমান কম থাকে। তবে, যতটুকু পরিমান কার্বোহাইড্রেট থাকে তার অধিকাংশই হল ফাইবার।

তাহলে, আখরোট কি – বিষয়টির উপর আমাদের প্রাথমিক ধারণা হয়ে গেল। এবারে এর পুষ্টিগুন নিয়ে কথা বলি।

আখরোটের পুষ্টিগুন কেমন?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ি এক কাপ বা ৩০ গ্রাম পরিমান আখরোটের পুষ্টি উপাদান নিম্নরুপ-

  • শক্তি: ২০০ ক্যালরি
  • কার্বোহাইড্রেট: ৩.৮৯ গ্রাম
  • সুগার: ১ গ্রাম;
  • ফাইবার: ২ গ্রাম
  • প্রোটিন: ৫ গ্রাম;
  • ফ্যাট: ২০ গ্রাম;
  • ক্যালসিয়াম: ২০ মিলিগ্রাম;
  • আয়রণ: ০.৭২ মিলিগ্রাম;
  • সোডিয়াম: ০ মিলিগ্রাম;

এছাড়াও, আখরোটে নিম্নলিখিত খনিজ লবন পাওয়া যায়-

  • ম্যাঙ্গানিজ;
  • কপার;
  • ম্যাগনেসিয়াম;
  • ফসফরাস;
  • ভিটামিন বি-৬;

আখরোটে মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড, মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড বেশি থাকে। এটিতে যে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সবচেয়ে বেশি পরিমানে থাকে তার নাম Alpha linoleic acid (ALA) যা আখরোটে বিদ্যমান মোট চর্বির ৮-১৪%।

বাস্তবিক অর্থে আখরোটই হল একমাত্র বাদাম যার ALA এর পরিমান সবচেয়ে বেশি। এই ALA হৃদপিন্ডের জন্য খুব উপকারি ভূমিকা পালন করে। দেহে কোন প্রদাহ থাকলে সেটিকে কমানোর ক্ষেত্রেও এটি কাজ করে।

উচ্চ ক্যালরি এবং উচ্চ চর্বিযুক্ত খাদ্য হিসাবে আখরোটের একটি বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। তবে, গবেষণায় দেখা যায়, এখানে অধিক পরিমান ক্যালরি ও চর্বি থাকা সত্ত্বেও এরা ওবেসিটির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়।

এরা প্রোটিন জাতিয় খাদ্য উপাদানেরও একটি ভাল উৎস। আখরোট খাওয়ার পর এর বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানসমুহ যেমন প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং ফাইবার সব মিলিয়ে আমাদের ক্ষুধা লাগার অনুভূতি দমিয়ে রাখে। যার ফলে খাদ্যের সাথে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহনের সুযোগ কমে যায়।

আখরোটের মধ্যে উপস্থিত ফাইটো ক্যামিকালস সমুহ এর আর এক প্রকারের গুরত্বপূর্ণ পুষ্টিগুন। আখরোট এন্টি অক্সিডেন্টে ভরপুর যা মুলত এর বাদামি আবরণের ভিতর জমা থাকে। কোন খাদ্যে সবচেয়ে বেশি এন্টি অক্সিডেন্ট থাকে এর উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১১১৩ টি খাদ্যের উপর পরিচালিত এক গবেষণায় আখরোটে এন্টি অক্সিডেন্টের পরিমান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হিসাবে পাওয়া গিয়েছে।

আখারোটে উদ্ভিদজাত পুষ্টি উপাদানসমুহ নিম্নরুপ-

  • Ellagic acid: এই এন্টি অক্সিডেন্ট আখরোটে প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায় যা হৃদরোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে কাজ করে।
  • Catechin: ইহা flavonoid এন্টি অক্সিডেন্ট যা হার্টে সুস্বাস্থ্য ধরে রাখাসহ আরোও বিভিন্ন রকমের উপকারিতা আছে।
  • Melatonin: এটি নিউরোহরমোন জাতিয় এন্টি অক্সিডেন্ট যা body clock নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে কাজ করে। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও এর ভূমিকা আছে।
  • Phytic acid: এরাও উপকারি এন্টি অক্সিডেন্ট।

পুষ্টিগুনের উপসংহারে বলা যায়, প্রচলিত খাদ্যের ভিতর এন্টি অক্সিডেন্টের সবচেয়ে ভাল উৎস হল আখরোট। যার মধ্যে ellagic acid, melatonin, catechin ইত্যাদি অন্তর্ভূক্ত।

আখরোটের উপকারিতা

ইতোমধ্যে আমরা আখরোট কি ও এর পুষ্টি গুন বিষয়ে অনেক কিছু জানলাম। এবারে, আখরোট এর উপকারিতা কেমন – এটি নিয়ে আলোচনা করব। এক কথায় বলতে গেলে, বাদামের মধ্যে এর উপকারিতা সবচেয়ে বেশি বললে ভুল হবে না। তবুও, এক এক করে আখরোটের উপকারিতা নিয়ে আমরা কথা বলি।

১. এন্টি অক্সিডেন্টের সবচেয়ে সেরা উৎস

অন্যান্য বাদামের তুলনায় এর এন্টিঅক্সিডেন্ট কার্য ক্ষমতা অনেক বেশি। এন্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতার জন্য এর ভিতরে বিদ্যমান ভিটামিন-ই, মেলাটোনিন এবং আরোও অন্যান্য ফাইটো কেমিক্যালস যেমন পলিফেনল ইত্যাদি উপাদান ভূমিকা পালন করে। আখরোট বাদামি রঙের যে আবরণ দিয়ে আবৃত থাকে সেখানেই এন্টিঅক্সিডেন্ট জমা হয়। এজন্য, ইহা খাওয়ার সময় কখনোও এর বাহিরের সেই আবরণ ফেলে দেওয়া ঠিক নয়।

বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, আমাদের দেহে ফ্রি রেডিক্যালস জনিত কারণে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস দেখা দিলে আখরোট খাওয়ার দ্বার এর এন্টি অক্সিডেন্ট কার্যকারিতার কারণে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমে যায়।

২. ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড বেশি থাকে

আখরোটে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের পরিমান বেশি যা আমরা এর পুষ্টিগুন থেকে ইতিমধ্যে জানতে পেরেছি। এক আউন্স বা ২৮ গ্রাম আখরোটে এই ফ্যাটি এসিডের পরিমান ২.৫ গ্রাম। আখরোটের ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের নাম আলফা লিনোলেনিক এসিড।  এটি হল প্রয়োজনিয় ফ্যাট যা খাদ্য থেকে আপনাকে গ্রহন করতে হয়।

পুষ্টিবিদগনের মতে, পুরুষ ও মহিলার ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের দৈনিক চাহিদা যথাক্রমে ১.৬ ও ১.১ গ্রাম যা আখরোটের single serving বা দৈনিক এক আউন্স পরিমান খেলেই তা পেতে পারি। গবেষণায় জানা যায় প্রতি গ্রাম আলফা লিনোলেনিক এসিড খেলে আপনার হৃদরোগে মৃত্যুঝুঁকি ১০% হারে কমে যায়।

৩. ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ দুরিকরণে কাজ করে

প্রদাহ হচ্ছে অনেক রোগের মুল। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এর কারণে প্রদাহ হতে পারে যার ফলে হৃদরোগ, ক্যানসার, এলজিমারস রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস হতে পারে। আখরোটে উপস্থিত পলিফেনল অক্সিডেটিভ স্ট্রেসজনিত প্রদাহের এর বিরুদ্ধে কাজ করে।

৪. পরিপাক তন্ত্রের স্বাস্থ ভাল রাখে

গবেষণা থেকে জানা যায়, আপনার gut বা পরিপাক তন্ত্রে যদি উপকারি অনুজীব বা ব্যাক্টেরিয় বেশি থাকলে আপনার খাদ্য হজম থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত বিষয়ের উন্নতি হবে। যদি gut – এ উপকারি অনুজীবের সংখ্য স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায় তাহলে বিভিন্ন রকমের জটিলতা দেখা দেয়।

আপনি যা খান তার উপরই পরিপাকতন্ত্রে উপস্থিত উপকারি অনুজীবের সংখ্যা কম-বেশি হওয়া নির্ভর করে। আখরোট খাওয়ার দ্বারা gut এর উপকারি অনুজীবগুলোও উপকৃত হয়। ফলে আপনার পরিপাক তন্ত্রের সঠিক কার্যক্ষমতা বজায় থাকে ও অনেক রোগের ঝুঁকি দুর হয়।

৫. ক্যানসারের ঝূঁকি কমে যায়

গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, আখারোট ব্রেস্ট, প্রোস্টেট, কোলোরেক্টাল ইত্যাদি জাতিয় ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। আখরোট খাওয়ার পর এর পলিফেনল নামের উপাদানটি gut অনুজীবের দ্বারা পরিবর্তন হয়ে ইউরোলিথিন হয়। ইউরোলিথিন এর এন্টি ইনফ্লামেটরি গুনাগুন থাকায় এটি কোলন ক্যানসারসহ অন্যান্য আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।

৬. দৈহিক ওজন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে

আখরোট ক্যালরি সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দৈহিক ওজন বাড়ানোর পরিবর্তে কমানোর ক্ষেত্রে এর ভূমিকা রয়েছে বলে গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে জানা যায়। এর একটি কারণ হল, আখরোট খাওয়ার পর এর প্রায় ২০% শরীরে শোষণ না হয়ে বের হয়ে যায়। আখরোট খাওয়ার পর পেট ভরে থাকার এক অনুভূতি তৈরি হয় যা খাওয়ার রুচি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।

৭. টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়

টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানোর একটি কারণ হিসাবে গবেষকগন মনে করেন, আখরোট আপনার দৈহিক ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করে। দৈহিক ওজন বেড়ে গেলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

৮. উচ্চ রক্ত চাপ কমাতে কাজ করে

হাই ব্লাড প্রেসারের ফলে স্ট্রোক ও হৃদরোগ হয়। দৈনিক এক আউন্স পরিমান আখরোট খেলে উচ্চ রক্ত চাপ কমে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগন মনে করেন।

৯. বয়স বাড়লেও স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে সহায়তা করে

বয়স বাড়ার কারণে আমরা অনেকেই দুর্বল হয়ে যাই। শারীকভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। এজন্য, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্ত এক্ষত্রে আপনাকে সহায়তা করতে পারে। স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহন করলে শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়ার ঝুঁকি ১৩% কমে যায় বলে গবেষণা থেকে জানা যায়।

আখরোটের পাশ্বপ্রতিক্রিয়া কি?

সাধারণ দৃষ্টিকোন থেকে আখরোট খুবই স্বাস্থকর একটি খাবার। কিন্তু কোন কোন মানুষের এলার্জিগত সমস্যার কারণে এটি এড়িয়ে যাওয়া ভাল।

আখরোট কোথায় পাওয়া যায়?

আপনি বড় বড় কাঁচা বাজার এবং ‍ডিপার্টমেন্টাল বা সুপার মার্কেটে আখরোট কিনতে পাবেন। তবে, কাঁচা বাজারে সাধরণত: খোলা অবস্থায় পাওয়া যেতে পারে যার পুষ্টি মান ভাল নাও হতে পারে। কিন্তু সুপার মর্কেটে যেমন স্বপ্ন, আগোরা, প্রিন্স বাজার – এসব জায়গায় ইনটেনক্ট প্যাকিং অবস্থায় পাবেন। দাম যদিও একটু বেশি হবে। কিন্তু, তারপরও, পুষ্টি মান বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আখরোটের দাম কত?

এটির দাম বেশ ভাল। তবে, এর পুষ্টি মান বিচার করে দাম শুনে পিছিয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ, ঔষধ যত ভাল ও ফলদায়ক হবে তার দামও তত বেশি হবে- এটাই স্বাভাবিক। বিভিন্ন প্যাক সাইজে আপনি আখরোট কিনতে পাবেন। যেমন ১০০ গ্রাম থেকে শুরু করে ২৫০ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম ইত্যাদি।

বাজারে খোজ নিয়ে জানা যায়, ২৫০ গ্রাম আখরোটের দাম  ৬০০ টাকা। তবে, ভারতের বাজারে দাম কিন্তু তুলনামুলক অনেক কম। অ্যামাজন ইন্ডিয়ায় এর দাম দেখার জন্য লিংকে ক্লিক করুন।

আখরোট খাওয়ার নিয়ম?

আখরোট খাওয়ার নিয়ম জটিল কিছু নয়। অন্য পাঁচটি খাবারের মতই সহজ।

  • রাতে ভিজিয়ে রাখুন এবং সকাল বেলায় খেয়ে নিন।
  • একসাথে দু’টি করে আখরোট খাবেন।
  • এটি আপনি সালাদের সাথে দিয়ে খেতে পারেন।

আখরোট কি ও এর আনুষঙ্গিক বিষয়ে উপস্থাপিত তথ্যসমুহ কেমন লাগল, কমেন্টের মাধ্যমে জানাবেন। ধন্যবাদ।