অলিভ অয়েল তেল: অলিভ অয়েল খাওয়ার নিয়ম ও এর পুষ্টিগুন!

অলিভ অয়েল তেল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চেলে খুব জনপ্রিয় এক খাদ্য পণ্য। বিভিন্নভাবে দৈনন্দিন এক ব্যবহার্য সামগ্রি। ইহা ফ্যাট জাতীয় খাদ্য যা এন্টি অক্সিডেন্টে খুবই সমৃদ্ধ। এর ফ্যাট প্রধানত: মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড দিয়ে গঠিত। যা বিশেষজ্ঞগণের নিকট স্বাস্থ্যসম্মত ও উপকারি ফ্যাট হিসাবে বিবেচিত।

এখানে উপস্থিত এন্টি অক্সিডেন্ট দেহের ভিতরে কোষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করে এবং কোষ নষ্ট হয়ে যাওয়াকে প্রতিহত করে। ফলে বহুবিধ জটিল রোগ থেকে বাঁচা যায়।

এই আর্টিকেলে, অলিভ অয়েল কি, অলিভ ওয়েল কত প্রকার, পুষ্টিগুনসহ  অলিভ অয়েল তেল এর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।

চলুন শুরু করি।

অলিভ অয়েল কি?

অলিভ অয়েল কি এর এক কথায় জবাব হল, ইহা এক প্রকার তরল তেল যা অলিভ (olive) ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। অলিভ ফল Oleaceae পরিবারভূক্ত Olea europaea প্রজাতির উদ্ভিদে জন্মে।

ইহা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খুব পরিচিত এক উদ্ভিদ। অধিক পরিমানে সেখানে জন্মাতে দেখা যায়। সাধারণত: রান্না-বান্নার কাজ থেকে শুরু করে কসমেটিকস, ফার্মাসিউটিক্যালস, সাবান তৈরি প্রভৃতি কাজে এর ব্যবহার লক্ষণীয়।

বিশ্বের কোথায় অলিভ ওয়েলের উৎপাদন বেশী হয়?

2019-20 অর্থ বছরে বিশ্বে অলিভ ওয়েলের মোট উৎপাদন হয়েছিল ৩.২ মিলিয়ন টন। যার প্রায় অর্ধেক পরিমান উৎপাদিত হয় স্পেনে। এছাড়া, অন্যান্য দেশ যেমন – ইটালি, তিউনিশিয়া, গ্রিস এবং তুরস্কে এর অধিক পরিমানে উৎপাদন করা হয়।

মাথাপিছু অলিভ ওয়েল খাওয়ার পরিমান সবচেয়ে বেশী গ্রিসে। গ্রিসে অলিভ ওয়েল ব্যবহার করার পরিমান প্রতি বছর জনপ্রতি প্রায় ২০ লিটার। এরপর রয়েছে ইটালি ও স্পেনের অবস্থান যেখানে মাথাপিছু ব্যবহারের পরিমান প্রায় ১৪ লিটার। এছাড়া, তিউনিশিয়া, পর্তুগাল, সিরিয়া, জর্ডান এবং লেবাননে এর ব্যবহারের পরিমান জনপ্রতি প্রায় ৮ লিটার। উত্তর অ্যামেরিকা ও উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে এর ব্যবহার তুলনামুলক কম যা জনপ্রতি প্রায় 0.7 লিটার (সুত্র: উইকিপেডিয়া)।

কিন্তু বিশ্বব্যাপি এর ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অলিভ অয়েলে তেল কি দিয়ে তৈরি?

অলিভ ওয়েল তেলের উপাদান কিছু বিষয়ের উপর ভিত্তি করে কম বেশী হয়। যেমন, কিভাবে চাষ করা হয়, কখন অলিভ ফল সংগ্রহ করা হয় এবং কোন পদ্ধতিতে অলিভস ফল থেকে তেলের নির্যাস বের করা হয় – ইত্যাদি।

এই তেল স্যাচুরেটেড এবং আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট দিয়ে গঠিত। তবে, আন স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি হিসাবে বিবেচিত, তার পরিমান ৭৫% থেকে ৮৫% এর মধ্যে থাকে।

আন স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিডের মধ্যে oleic acid নামের মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিডের পরিমান প্রায় ৮৩%। আর পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিডের মধ্যে থাকে linoleic acid। এছাড়া, স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড হিসাবে থাকে palmitic acid।

অলিভ অয়েলের পুষ্টিগুন কেমন?

এক চা চামুচ তেলে আপনি যে সব পুষ্টি উপাদান পেতে পারেন, তা নিম্নরুপ-

  • ক্যালরি: ১১৯
  • প্রোটিন: ০ গ্রাম
  • ফ্যাট: ১৩.৫ গ্রাম
  • স্যাচুরেটেড ফ্যাট: ১.৯ গ্রাম
  • মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড (MUFA): 9.9 গ্রাম
  • পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড: ১.৪ গ্রাম
  • ভিটামিন-ই: ১.৯ মিলিগ্রাম
  • ভিটামিন-কে: ৮.১৩ মাইক্রোগ্রাম
  • কার্বোহাইড্রেট: ০ গ্রাম
  • ফাইবার: ০ গ্রাম
  • সুগার: ০ গ্রাম

অলিভ অয়েল তেল হচ্ছে খাটি বিশুদ্ধ ফ্যাট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (USDA) কর্তৃক প্রণীত MyPlate নির্দেশিকা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর ফ্যাট তাকেই বলা হয় যার মধ্যে সুগার ও ফাইবারসহ প্রোটিন এবং কার্বোহাইড্রেট অনুপস্থিত থাকে। এর অধিকাংশই স্বাস্থ্যকর ফ্যাট হিসাবে পরিচিত মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড দিয়ে তৈরি যা হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারি। এর মধ্যে  পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমান কম থাকে।

রান্নায় ফ্যাট জাতিয় দ্রব্যের ব্যবহারের একটি গুরত্বপূর্ণ উপকারি দিক হচ্ছে, এরা দেহের ভিতর চর্বিতে দ্রবনীয় ভিটামিনসমুহের শোষণ কাজে সহায়তা করে। ফ্যাট সলিউবল ভিটামিনগুলো ভিটামিন-এ, ডি, ই এবং কে। যদি আপনি খাদ্যের সাথে চর্বি জাতীয় খাদ্য উপাদান গ্রহন না করেন তাহলে ক্ষুদ্রান্ত থেকে এই সব ভিটিামিন দেহে শোষণ হতে পারে না।

এর ফলে, দেহে নানা রকম জটিলতার সৃষ্টি হয়।

অলিভ অয়েল কয় প্রকার?

অলিভ ওয়েল তেলের প্রকারভেদ নিয়ে অনেক সন্দেহ রয়েছে। কোন ধরনের তেল ভাল আর কোনটি খারাপ – এগুলো নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়। নিচে সংক্ষেপে অলিভ ওয়েল তেল কত প্রকার এবং তার গুনাগুন তুলে ধরা হচ্ছে-

এক্সট্রা ভারজিন অলিভ ওয়েল

এটি হল সবচেয়ে ভাল মান সম্পন্ন তেল এবং এর দাম সবচেয়ে বেশী। ইহা সম্পূর্ণরুপে অপোরিশোধিত তেল। এর এসিডিটি লেভেল ০.৮% এর বেশী নয় যা অন্যান্য অলিভ ওয়েলের তুলনায় সবচেয়ে কম। কোন প্রকার তাপ এবং রাসায়নিক পদার্থের প্রয়োগ ছাড়া এই ধরণের অলিভ ওয়েল তেল প্রস্তুত করা হয়। এর ফলে এর মধ্যে বিদ্যমান থাকে অলিভস এর অরিজিনাল সুগন্ধ।

এর মধ্যে উপস্থিত পুষ্টি উপাদান সমুহের মান পুরোপুরি অক্ষত অবস্থায় থাকে। এটি সাধারণত: রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়।

ভারজিন অলিভ ওয়েল

ইহা এক্সট্রা ভারজিন অলিভ অয়েল তেল এর তুলনায় কিছুটা নিম্ন মানের। এর এসিডিটি লেভেল প্রায় ১.৫%। এর রয়েছে খুব সুন্দর সুগন্ধ এবং এটিও রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে, বাজারে এটি সচারাচর পাওয়া যায়ন। একটু বিরল প্রকৃতির তেল।

রিফাইনড অলিভ ওয়েল

ইহা পরিশোধিত তেল। এটি সচারাচর মুদি বা গ্রোসারি দোকানে পাওয়া যায়। দামে এটি তুলনামুলক সস্তা। এক্সট্রা ভারজিন ও ভারজিন তেলের তুলনায় এর পুষ্টি উপাদান এবং স্বাদ ও গন্ধে নিম্ন মানের। এখানে এন্টি অক্সিডেন্টের পরিমান কম। বাজারে যে সব অলিভ ওয়েলের গায়ে পিউর অলিভ ওয়েল বা শুধু অলিভ ওয়েল লেখা থাকে, তারাই হচ্ছে রিফাইনড অলিভ ওয়েল। পরিশোধনের সময় এতে তাপ ও কেমিক্যালস এর ব্যবহার হয়। তাই, এটি নিম্ন মানের।

কোন ধরণের অলিভ অয়েল খাওয়া উচিত?

কেনার সময় এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল তেল কেনা ভাল। কারণ, এটিতে তাপ ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে প্রক্রিয়াজাত করা হয়নি। তাই, ইহা অপরিশোধিত তেল। এর মধ্যে আপনি পাবেন অলিভ ওয়েলের আসল সুগন্ধ।  এর সমস্ত পুষ্টি উপাদান থাকে অক্ষত।

অলিভ ওয়েল মুখে দিলে কি হয়?

প্রাচিন কাল ধরে, ভারত বর্ষে মুখে অলিভ অয়েল তেলের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। কেননা, এতে রয়েছে নানা বিধ স্বাস্থ্যগত উপকার। নিচে এর কয়েকটি উল্লেখ করা হল-

১. মুখের ভিতর ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া দমনে:

মুখে নানা রকমের ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া বসবাস করে। যা দাত ও দাতের মাড়িতে বিভিন্ন প্রকার সমস্যা তৈরির জন্য দায়ী। আপনি মুখে অলিভ অয়েল তেল ব্যবহারের মাধ্যমে মুখের ভিতর ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়ার প্রভাব কমিয়ে আনতে পারেন।

২. মুখের দুর্গন্ধ দুর করে:

মুখের দুর্গন্ধ চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় Halitosis বলে যা পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মাঝেই দেখা যায়। এর পিছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ আছে, যেমন- দাত ও দাতের মাড়ির ইনফেকশন, মুখের স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব, মুখের দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, জিহ্বায় প্রলেপ লেগে থাকা ইত্যাদি। এই অবস্থায় মুখে বিদ্যমান জীবানু খুব সহজেই বংশ বিস্তার করে নানা রকম ক্ষতি সাধন করতে পারে। এন্টিসেপটিক মাউথ ওয়াশ করে আপনি এটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। তবে, মজার বিষয় হল, মুখে অলিভ অয়েল তেল ব্যবহার করেও আপনি এই অবস্থা থেকে পরিত্রান পেতে পারেন। যা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে।

৩. দাতের মাড়ির উপর গহ্বর সৃষ্টি হওয়া প্রতিরোধ করে:

সাধারণত মুখের স্বাস্থ্যহানি ঘটলে দাতের পচন শুরু হয়। যার ফলে দাতের মাঝে মাড়ির উপরের অংশে গহ্বর বা cavity সৃষ্টি হয়। এই তেল প্রয়োগ করে উপকার পেতে পারেন।

৪. প্রদাহ দমনের মাধ্যমে দাতের মাড়ির উন্নতি সাধন করে:

Gingivitis রোগটি দাতের মাড়িতে প্রদাহের ফলে তৈরি হয়।  যার ফলে মাড়ি ফুলে যায়, লালচে বর্ণ ধারণ করে এবং মৃদু রক্ত বয়ে যায়। দাতের মাড়িতে ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয় plaque বা আবরণ তৈরির ফলে এটি হয়। অলিভ অয়েল তেল মুখে দিয়ে আপনি এই অবস্থার উন্নতি করতে পারেন।

৫.নিয়মিত ব্যবহার সহজ ও সস্তা:

এটি যেহেতু আপনার রান্না ঘরে থাকে তাই এর জন্য আপনার বাড়তি পয়সা খরচের প্রয়োজন হবে না।

অলিভ অয়েল খাওয়ার নিয়ম কি?

অলিভ অয়েল তেলের বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে। রান্না-বান্না থেকে শুরু করে অনেক কাজেই এর ব্যবহার সমাদৃত। তবে, অলিভ অয়েল খাওয়ার নিয়ম সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া ভাল।

নিচে অলিভ ওয়েল তেল খাওয়ার কয়েকটি নিয়ম বলা হল-

  • রান্নার কাজে: রান্নার সময় মনে রাখতে হবে, অলিভ অয়েল সহ যেকোন তেল যদি অধিক সময় ধরে তাপের ভিতর থাকে তাহলে এর পুষ্টিগুন খারাপ হয়ে যায়। তাই, এর পুষ্টিগুন ধরে রাখার জন্য রান্নার কাজে যত কম সময় এটিকে তাপে রাখা যায় তত ভাল।
  • রুটি দিয়ে: অলিভ ওয়েল তেলের ভিতর রুটি ভিজিয়ে খাওয়া।
  • সালাডের সাথে: সালাড বা সবজির সাথে মিশিয়ে ।
  • সরাসরি পান করে: তবে এক্ষেত্রে দৈনিক ৬০ এম এল এর বেশী নয়।

অলিভ অয়েলের দাম কত?

বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হরেক রকম প্যাক সাইজে ‍অলিভ অয়েল তেল বাজারজাত করা হয়। এর গুনগত ঐ ব্র্যান্ডসমুহের সুনাম ও বৈশিষ্টের উপর তারতম্য হতে পারে। তাই এর দামেরও ভেদাভেদ লক্ষণীয়।

সময়ে সময়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারে এর দাম উঠা নামা করতে দেখা যায়। ভারতের বাজারে অ্যামাজন ইন্ডিয়ার সুত্র অনুযায়ি ধরণভেদে এর দাম উল্লেখ করা হল।

ভাল মান সম্পন্ন এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল তেল এর বাজার মুল্য প্রায় ১২০০ রুপি। রিফাইনড বা পরিশোধিত তেলের দাম এর প্রায় অর্ধেকের মত।

অ্যামাজন ইন্ডিয়া থেকে এর কয়েকটি ব্র্যান্ডের নাম সহ দাম দেখে নিন।

অলিভ ওয়েলের ছবি কেমন?

অলিভ এক প্রকার ফল যা উদ্ভিদে জন্মে। এই গাছ থেকে অলিভ ফল সংগ্রহ করে যান্ত্রিকভাবে পিষিয়ে সেখান থেকে এর নির্যাস তরল হিসাবে বের করা হয়।

আমাদের দেশে জলপাই ফলের মত দেখতে। নিচে অলিভ অয়েলের ছবি হিসাবে এর গাছসহ ফলের ছবি দেওয়া হল।

অলিভ অয়েল তেল

বন্ধুগন, অলিভ অয়েল তেল সম্পর্কে তথ্যসমুহ যদি উপকারি মনে হয় তাহলে পরবর্তি পোষ্টের তথ্য পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ-এ একটি লাইক দিয়ে দিন।

 

 

 

3 thoughts on “অলিভ অয়েল তেল: অলিভ অয়েল খাওয়ার নিয়ম ও এর পুষ্টিগুন!”

Comments are closed.