ব্লক প্রিন্টিং কি ও কিভাবে করা হয়?

ব্লক প্রিন্টিং অনেকের জন্য শখ, আবার অনেকের জন্য পেশা। শখই হোক বা পেশাই হোক, প্রিন্টিং এর শুরু হাজার বছর আগে থেকেই। প্রিন্টিং এর যত ধরন আছে, ব্লক প্রিন্টিং তার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো। অন্তত খিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে প্রিন্টিং সূচনা হয়েছিল বলা যায়। প্রতœতত্ত¡বিদদের মতে, প্রিন্টিং এর যাত্রা শুরু হয়েছিল চীন ও জাপানের আশেপাশে। পনেরশো শতাব্দীর অনেক ব্লক প্রিন্টিং এর নিদর্শন এখনো আমরা দেখতে পাই।

আগে ব্লক প্রিন্টিং হাতে করা হতো। হাতের ব্লক প্রিন্টিং খুবই সময়সাপেক্ষ তবে এর শৈল্পিক গুনাগুন অনেক বেশি। এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেশিনের মাধ্যমে ব্লক প্রিন্টিং করা হয়। এতে উৎপাদন অনেক বেশি হলেও কারুকার্য ও সৌন্দর্য অনেক কম থাকে।

টেক্সটাইল প্রিন্টিং একধরণের ব্লক প্রিন্টিং। আজকে আমরা টেক্সটাইল প্রিন্টিং সম্পর্কে জানব। তবে প্রথমেই ব্লক প্রিন্টিং আসলে কি এবং কত ধরণের ব্লক প্রিন্টিং দেখা যায়, তা জেনে নেই।

ব্লক প্রিন্টিং কি?

এটি প্রকৃতপক্ষে চাপ দেয়া একটি প্রিন্টিং পদ্ধতি। এখানে খোদাই করা একটি বস্তু থাকে যাকে আমরা ব্লক বলি। ব্লক যে কোন পদার্থের তৈরি হতে পারে। কাঠ, রাবার, প্লাস্টিক, লিনোলিয়াম ইত্যাদি। এর সাথে কালি মাখিয়ে কাপড় বা কাগজের উপর চাপ দেয়া হয়। ব্লকটি আসলে স্ট্যাম্পের মত কাজ করে। ব্লকে খোদাই করা যে নকশা থাকে, তার একটি উল্টো ছাপ সেই কাপড় বা কাগজের উপরে পড়ে। এটিকে বলা যায় ব্লকের মিরর ইমেজ।

একটি ব্লক বানিয়ে কাগজে বা কাপড়ে বারবার একই নকশা তৈরি করা যায়। মূলত এ কারণেই ব্লক প্রিন্টিং এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল হাজার বছর আগেই। প্যাম্পলেট, পোস্টার, বিজ্ঞাপন, নোটিশ থেকে শুরু করে মোটা মোটা বই ছাপা হত ব্লক প্রিন্টিং এর মাধ্যমে। আর কাপড়ে নকশা এনে দেয় বাহারি মানের পোশাক। ভালো মানের ব্লক ও দক্ষ শিল্পীর ছোঁয়ায় ছাপা হতো সুন্দর সুন্দর নকশা।

ব্লক প্রিন্টিং কত প্রকার?

ব্লক প্রিন্টিং যেহেতু অনেক পুরনো একটি শিল্প, এর অনেকগুলো পদ্ধতি এখনো পর্যন্ত আমাদের সামনে এসেছে। তার মধ্যে বহুল প্রচলিত কিছু ব্লক ব্লক প্রিন্টিং সম্পর্কে বলছি।

কাঠের উপর ব্লক প্রিন্টিং

ব্লক প্রিন্টিং এর সবচেয়ে প্রাচীন ধরণ হলো কাঠের উপর খোদাই করে নকশা বা ছবি আঁকা। সাধারণত খুব শক্ত কাঠের তক্তার উপর সুক্ষ হাতিয়ার ব্যবহার করে এই নকশা তৈরী করা হয়। নরম কাঠ এই কাজের জন্য মোটেই উপযুক্ত নয় কেননা সুক্ষ নকশা নরম কাঠ ধরে রাখতে পারে না। এখন কাঠের উপর ব্লক প্রিন্টিং এর জন্য সিএনসি মেশিন ব্যবহার করা হয়। কম্পিউটারে নকশা করে দিলেই মেশিনটি অবিকল খোদাই করে নকশা একে দেয়। লেজার মেশিন দিয়েও পোড়া নকশা করা যায়।

কাপড়ের উপর ব্লক প্রিন্টিং

কাপড়ের উপর ব্লক প্রিন্টিং এর জন্য ভারত সারাবিশে^র মধ্যে সেরা। জয়পুর এর ব্লক প্রিন্ট আমাদের দেশেও সমাদৃত। অন্যান্য দেশের ব্লক প্রিন্টিং এর সাথে জয়পুরের ব্লক প্রিন্টিং এর পার্থক্য এর শতবছরের ঐতিহ্য ও রং-কাপড়ের বৈচিত্রের মধ্যে ধরা পড়ে। নকশা প্রথমে কাঠের ব্লকে খোদাই করা হয়। সাথে জুড়ে দেওয়া হয় একটা হ্যান্ডেল। এরপর ব্লকটি একটা রংয়ে ডুবিয়ে তারপর বড় কাপড়ের টুকরায় ছাপ দেয়া হয়। যেহেতু সম্পুর্ণ কাজটি হাতে করা হয়, নকশাগুলো সমান ও অবিকল এক হয় না। তবে শৈল্পিকগুণে এর অবস্থান ডিজিটাল প্রিন্টের চেয়ে অনেক উপরে। এটারই আরেক নাম টেক্সটাইল প্রিন্টিং

জাপানী উকিওই কাঠের ব্লক প্রিন্ট

উকিওই ব্লক প্রিন্ট কয়েকশো বছর আগে জাপানে শুরু হলেও এর ব্যাপকতা শুরু হয় ইডো স¤্রাজ্যের সময়কালে। সতেরো থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে জাপানের ঘরে ঘরে পৌছে যায় এই ব্লক প্রিন্ট। এই প্রিন্টের ক্ষেত্রে একই কাপড় বা কাগজের উপর একাধিক ব্লকের ছাপ দেয়া হয়। প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন রংয়ের। কালিও ব্যবহৃত হয় বিশেষ ধরণের। ফলে এটি দেখতে অনেকটা তৈলচিত্রের মতো হয়।

উকিওই প্রিন্ট মধ্য ঊনবিংশ শতাব্দির দিকে পশ্চিমে রপ্তানি শুরু হয়। ইউরোপে চিত্রকর্মে নতুন ধারা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় এই প্রিন্ট। মানেট, ভ্যানগগের চিত্রকর্মে উকিওই প্রিন্টের ব্যাপক প্রভাব আছে বলে জানা যায়।

লিনোলিয়ামের উপর ব্লক প্রিন্ট

এটা কাঠের ব্লক প্রিন্টের মতোই। শুধু কাঠের পরিবর্তে লিনোলিয়াম ব্লক ব্যবহার করা হয়। আঠারো শতাব্দির মাঝের দিকে ইউরোপে এই ব্লক প্রিন্টিং খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রিন্টিং এর জন্য লিনোলিয়ামের জনপ্রিয়তা কারণ হলো লিনোলিয়াম কাঠের তুলনা নরম, তাই খোদাই করা সহজ। আবার সহজে ছিড়ে বা নকশা নষ্ট হয়ে যায় না, তাই সুক্ষ ভাবে নকশা করা যায়। নতুন ও শখের শিল্পীদের জন্য লিনোলিয়াম আদর্শ।

রিডাকশন বা ক্ষয়িষ্ণু ব্লক প্রিন্টিং

এই পদ্ধতিটির ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করে তোলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো। ১৯৫০-৬০ সালের এর দিকে এটি খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সাধারণত একটিমাত্র ব্লক ব্যবহার করে অনেকগুলো প্রিন্ট করা হয়। ব্লকটি সাধারণত লিনোলিয়ামের তৈরী হয় কেননা এটার উপর খোদাই করা সহজ। অন্যন্য প্রিন্টিং পদ্ধতির তুলনায় এটি আলাদা কারণ অন্যান্য ক্ষেত্রে একই কাজের জন্য একাধিক ব্লক লাগে। এক লেয়ার নকশার পর একই ব্লকে সামান্য পরিবর্তন এনে আবার ছাপ দেয়া হয়। এতে ব্লক কম লাগে। তবে একবার ব্লকে পরিবর্তন এনে তা আবার পূর্বাবস্থায় ফেরত আনা যায় না বিধায় এই পদ্ধতিতে উৎপাদন কম হয়। সাধারণত এই পদ্ধতিতে করা নকশাগুলো লিমিটেড এডিশন হিসেবে বিক্রয় হয়। এছাড়া, খোদাই করতে ভূল হলে পুরো কাজটিই বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই নতুনদের জন্য এই পদ্ধতিটি খুবই কঠিন।

রাবার স্ট্যাম্প

লিনোলিয়ামের মতো রাবারও নরম এবং এতে নকশা খোদাই করা সহজ। রাবার স্ট্যাম্প অপেক্ষাকৃত ছোট এবং এতে কাঠের বা প্লাস্টিকের হাতল জুড়ে দেয়া হয়। আর থাকে একটি কালির প্যাড। রাবার স্ট্যাম্প আমাদের দেশে সব জায়গাতেই দেখা যায়। অফিস আদালত, দোকানপাটে সবাই প্রতিষ্ঠানের চিহ্ন বা সিল হিসেবে রাবার স্ট্যাম্প ব্যবহার করে।

ব্লক প্রিন্টিং কিভাবে করা হয়?

অনেকভাবেই ব্লক প্রিন্টিং করা যায়। একটা আরেকটা থেকে সামান্য ভিন্ন। আর এ ভিন্নতা মূলত ব্লক প্রিন্টের ধরণ, কাপড় বা কাগজ কোনটার উপর নকশার ছাপ বসবে এবং কে কিভাবে শিখেছে, তার কারণেই হয়। আমরা এখন ব্লক প্রিন্টিং এর ধাপগুলো জানবো।

১. যে নকশা বা চিত্র কাপড় বা কাগজে ছাপ দিতে হবে, তার একটা নকশা প্রথমেই ব্লকে একে নিতে হবে। এটি হাতে বা কম্পিউটারে করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে যে, ব্লকে নকশা বা ছবিটি হতে হবে মিরর ইমেজ। অর্থ্যাৎ, যে নকশা বা ছবি চাই, ব্লকে তার উল্টো ছবি বা নকশা আঁকতে হবে।

২.  ব্লকে এবার নকশা অনুযায়ী খোদাই করতে হবে। হাতে করার জন্য একটি তীক্ষ ছুরি নিয়ে ধীরে ধীরে ব্লকের উপর থেকে চেঁছে ফেলতে হবে। লাইনগুলো খেয়াল রাখতে হবে যেন কেটে না যায়। তাড়াহুরো কোনভাবেই কাম্য নয়। হাতে না পারলে সিএনসি মেশিনের মাধ্যমেও করা যায়। তবে হাতের কাজের শৈল্পিক গুনাগুণ অনেক বেশি হবে।

৩. খোদাই করা শেষ হলে ব্লকটি কোন হাতলে আটকিয়ে নিতে হবে। আর ব্লকটি পুরুত্ব যদি বেশী হয়, তবে হাতলের প্রয়োজন পড়ে না। হাতল আসলে ধরার সুবিধার জন্য। নকশায় এর কোন ভূমিকা নেই।

৪. ব্লকটির কাজ শেষ হলে কাপড় বা কাগজটি সমান টেবিলের উপর টানটান করে আটকিয়ে নিতে হবে। একাধিক ছাপের মাধ্যমে কোন সিরিজ নকশা করতে হলে দাগ টেনে নেয়া ভালো।

৫. ব্লকের নকশার উপর উপযুক্ত কালি লাগিয়ে নিতে হবে। এটা খুব সাবধানে করতে হবে। এর জন্য এটা সমান কাঠ বা অন্য কোন কিছুর উপর কালি ঢেলে একটা রোলার দিয়ে ডলতে হবে। পুরো রোলারে কালি লেগে গেলে এবার রোলার দিয়ে ব্লকের উপর ডলতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন পুরো ব্লকে কালি সমানভাবে লাগে।

৬. এরপর, ব্লকটি সাবধানে কাপড় বা কাগজের উপর রেখে চাপ দিতে হবে। হাতে বা ভারি কিছু দিয়ে চাপ দেয়া যায়। তবে মনে রাখতে হবে, চাপ দেয়ার সময় যেন ব্লকটি সরে না যায়। ব্যাস, ব্লকটি সরালেই হয়ে গেল ব্লক প্রিন্টিং।

টেক্সটাইল প্রিন্টিং বলতে কাপড়ের উপর ব্লক প্রিন্ট দেয়া বোঝায়। সাধারণত, শাড়ি, কামিজ ইত্যাদিতে ব্লক প্রিন্ট দেয়া হয়। এগুলোকে ব্লকের কাজ বলে। এখন অবশ্য টেক্সটাইল প্রিন্টিং এর একটি সহজ ধরণ প্রচলিত যাকে বলা হয় স্ক্রিন্ট প্রিন্ট। এখানে ব্লক ব্যবহার করা হয় না, বরং একটি মেশ শীটে নকশা প্রিন্ট করা হয় কম্পিউটার দিয়ে। সেটি কাপড়ের উপর রেখে তার উপর কালি ঘষা দিলেই মেশ শীটের ডিজাইন কাপড়ে পড়ে যায়। একই নকশায় অধিক পরিমাণ প্রিন্ট করতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

আপনি যদি টেক্সটাইল প্রিন্টিং এ আগ্রহ বোধ করেন বা বাসায় নিজেদের কাপড়ে ইচ্ছেমতো নকশা করতে চান, সংগ্রহ করে ফেলুন কাঠের ব্লক, রং আর রোলার, হয়ে যান একজন শখের ব্লক প্রিন্টের শিল্পী।

Author Bio:

bishra  Tarin Bushra Zaman, MS in Cultural Anthropology, Rajshahi University, Bangladesh.
আমি  একজন ফ্রিল্যান্স আর্টিকেল রাইটার, বর্তমানে upwork এ কাজ করছি।