১০ টি সহজ নিয়মে ট্রাইগ্লিসারাইড কমানোর উপায়!

ট্রাইগ্লিসারাইড কমানোর উপায় বলার আগে ট্রাইগ্লিসারাইড কেন বেড়ে যায় – তা আপনার জানতে হবে। কেননা, এর মাধ্যমে আপনি যখন সমস্যার কারণটি চিহ্নিত করতে পারবেন, তাহলে তা থেকে পরিত্রানের উপায় আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন- এটাই স্বাভাবিক।

যাহোক, ট্রাইগ্লিসারাইড এক প্রকার চর্বি বা ফ্যাট যা মানব দেহের রক্তে বিদ্যমান থাকে। খাদ্য খাওয়ার পর আপনার দেহে যে পরিমান ক্যালরি উৎপাদন হয় তা যদি অব্যবহৃত অবস্থায় থেকে যায় তবেই বিপদ।

কারণ, এই অব্যবহৃত ক্যালরি পরিবর্তন হয়েই ট্রাইগ্লিসারাইড হয়। যা আপনার শরীরে চর্বিকনা হিসাবে জমা হবে।

ক্যালরি কি ও কিভাবে ব্যবহৃত হয় এর বিস্তারিত অন্য একটি পোষ্টে আলোচনা হয়েছে। দেখে নিলে ভাল হয়।

এই আর্টিকেলে ট্রাইগ্লিসারাইড কমানোর উপায় নিয়ে কথা বলব। এখানে ১০ টি পদ্ধতি উল্লেখ করা হবে যা অনুসরণ করলে আপনি সহজেই আপনার রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড লেভেল কমানোর যাত্রায় সফল হবেন বলে আশা করি।

তাহলে, চলুন, দেখে নেই – উপায়সমুহ কি কি?

ট্রাইগ্লিসারাইড কমানোর উপায়

দৈহিক ওজন কমানোর মাধ্যমে

আপনি যখনই প্রয়োজনের তুলনায় খাদ্যের সাথে অধিক ক্যালরি গ্রহন করবেন, আপনার শরীর অতিরিক্ত এই ক্যালরি ট্রাইগ্লিসারাইডে রুপান্তর করবে। পরে তা ফ্যাট হিসাবে শরীরে জমে থাকবে।

এজন্যই, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমানোর জন্য আপনার দৈহিক ওজন কমানো হচ্ছে একটি কার্যকর পন্থা।

গবেষণা থেকে জানা যায়, আপনি যদি দৈহিক ওজন ৫-১০% কমাতে পারেন, তাহলে আপনার রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড মাত্রা ৪০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার কমে যাবে।

কিন্তু এর লক্ষ্য উদ্দেশ্য হল- শরীরের ওজন কমে যাওয়ার পর তা দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখতে হবে। এমন যেন না হয়, ওজন কমানোর পর নিয়ম না মেনে খাবার খাওয়ার কারণে কিছুদিন পরই আবার দৈহিক ওজন আবার বেরে গেল।

তবে, গবেষণায় এটিও দেখা গিয়েছে যে, দেহের ওজন কমে যাওয়ার পর বেশ কিছু দিনের জন্য ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কম হয়ে যায়, যদিও আপনার ওজন তারপর কিছুটা হলেও বেড়ে যায়।

কাজেই, সারমর্ম আকারে বলা যায়, দৈহিক ওজন ৫% কমানো গেলেও রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমানোর ক্ষেত্রে এর ফলপ্রসু ভূমিকা থাকে।

সুগার গ্রহনের পরিমান সীমিত করে

খাদ্যের সাথে সুগার বা চিনি যোগ করে খাওয়া – বিষয়টি খুব সাধারণ ঘটনা। আমরা অনেকেই খাদ্যের স্বাদ বৃদ্ধির জন্য এই চর্চা অহরহ করে থাকি।

অ্যামেরিকান হার্ট ফাউন্ডেশনের সুপারিশ মতে দৈনিক ৬-৯ চা চামুচের অধিক অ্যাডেড সুগার খাওয়া উচিত নয়। যেখানে অ্যামেরিকানদের গড়ে দৈনিক প্রায় ১৯ চা চামুচ সুগার খাওয়ার বিষয়টি ২০০৮ সালে পরিচালিত এক গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে জানা যায়।

মিষ্টিজাত খাদ্য পন্য, কোমল পানিয়, ফলের জুস ইত্যাদির ভিতর সুগার লুকায়িত হিসাবে বিদ্যমান থাকে।

আপনার খাদ্যের অতিরিক্ত সুগার ট্রাইগ্লিসারাইডে পরিণত হবে যা আপনার রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে যাবে। এর ফলে হৃদরোগ রোগসহ অন্যান্য জটিল রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।

পনের বছর যাবত পরিচালিত এক গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায়, যারা ক্যালরির কমপক্ষে ২৫% সুগার থেকে গ্রহন করে তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার দ্বিগুন সম্ভাবনা তৈরি হয় তাদের তুলনায় যারা সুগার থেকে ১০% এর কম ক্যালরি গ্রহন করে।

শিশুদের ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও অ্যাডেড সুগারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অপর এক গবেষণায় প্রমান পাওয়া যায়।

সৌভাগ্যক্রমে, বেশ কিছু গবেষণা প্রমান করে, কম সুগার এবং কম কার্বোহাইড্রেট বিশিষ্ট খাদ্য গ্রহনের মাধ্যমে আপনি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমিয়ে আনতে সমর্থ হবেন।

এমনকি, চিনি দিয়ে বানানো মিষ্টি পানিয় এর পরিবর্তে শুধু সাদা পানি খাওয়ার মাধ্যমে আপনি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা ২৯ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারেন।

সারমর্ম: চিনিযুক্ত বা অ্যাডেড সুগার বিশিষ্ট খাদ্য যেমন, সোডা, জুস ও অন্যান্য মিষ্টান্ন সামগ্রি পরিত্যাগের মাধ্যমে রক্তের রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বহুলাংশে কমানো যায়।

কম কার্বস বিশিষ্ট খাদ্য খেয়ে

অ্যাডেড সুগারের মতই খাদ্যে অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট থাকলে তা ট্রাইগ্লিসারাইডে রুপান্তর হয়ে যায় এবং পরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফ্যাট হিসাবে জমতে শুরু করে।

অবাক হওয়ার মত কোন তথ্য নয়, বরং বাস্তব কথা হল – কম কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারের সাথে রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমে যাওয়ার একটি যোগসুত্র আছে।

একটি গবেষণায় পাওয়া যায়, যাদের কার্বোহাইড্রেট থেকে ২৬% ক্যালরি দেওয়া হয়েছিল তাদের রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা ব্যপক হারে কমে গিয়েছিল তাদের তুলনায় যাদের কার্বোহাইড্রেট থেকে ৫৪% ক্যালরি দেওয়া হয়েছিল।

কম কার্বোহাইড্রেট বিশিষ্ট খাবার দৈহিক ওজন কমাতে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে, এরা খুব ফলপ্রসুভাবেই রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমিয়ে দেয়।

সারমর্ম: কম কার্বস বিশিষ্ট খাদ্য তাৎপর্যপূর্ণভাবে রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমাতে সহায়তা করে।

অধিক ফাইবারযুক্ত খাদ্য

সাধারণত: ফলমুল, শাক-সবজি এবং পুরো শষ্য দানা বা whole grain জাতীয় খাদ্যে ফাইবার থাকে। ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবারের অন্যান্য ভাল উৎস হল বাদাম, সিরিয়াল এবং লিগিউম জাতীয় খাদ্য।

আপনি যদি খাদ্যের সাথে অধিক ফাইবার খেতে পারেন তাহলে এই ফাইবার আপনার ক্ষুদ্রান্ত থেকে সুগার ও ফ্যাট শোষনের হার কমিয়ে দিবে। যার ফলে, রক্তে সুগার অধিক হওয়ার সুযোগ থাকেনা। ফলে, ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও দুর হয়ে যাবে।

কাজেই, এক কথায় বলা যায়, অধিক ফাইবার যুক্ত খাদ্য যেমন ফল-মুল, সবজি ও whole grain খেলে রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমে যাবে।

নিয়মিত ব্যায়াম করে

দৈহিক কর্মকান্ডের অংশ হিসাবে নিয়মিত শরীর চর্চায় অংশ নিলে আপনার দেহের ইগ্লিসারাইড কমে যাবে। ইগ্লিসারাইড কমানোর ক্ষেত্রে শরীর চর্চার অসাধারণ ভূমিকা আছে।

আমরা জানি, দৈহিক ব্যায়ামের ফলে ক্যালরি বার্ন হয়। ফলে তা আর ট্রাইগ্লিসারাইডে পরিণত হওয়ার সুযোগ থাকে না।

কাজেই ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ খুব উপকারি একটি বিষয়। কিন্তু এর ফলাফল নিচের বিষয়গুলির উপর নির্ভর করে-

  • আপনার প্রাথমি ইগ্লিসারাইড লেভেল এর পরিমান
  • দৈহিক ব্যায়াম এর পরিমান
  • শরীর চর্চার তীব্রতার পরিমান

অ্যারোবিক শরীর চর্চার (aerobic) ফলে দেহে ভাল কোলেস্টেরলের পরিমান বৃদ্ধি পায়। আর, এই ভাল কোলেস্টেরল ইগ্লিসারাইডের পরিমান কমাতে সহায়তা করে। অ্যারোবিক শরীর চর্চার অর্থ হল যে সব দৈহিক কার্যক্রম খোলা বাতাসের ভিতর করা হয়, যেমন, হাটা, দৌড়ানে, জগিং, সাইক্লিং, সাতার কাটা ইত্যাদি।

পরামর্শ: দৈনিক ৩০ মিনিট ধরে হাটার মাধ্যমে আপনি শরীর চর্চা শুরু করে দিতে পারেন। হাটার পাশাপাশি প্রথম প্রথম সহজ ব্যায়াম যেমন সাইক্লিং বা সুইমিং এ অংশ নিতে পারেন।

ট্র্যানস ফ্যাট পরিহার করে

কৃত্রিম ট্র্যানস ফ্যাট হল এমন ধরণের ফ্যাট যা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যে যোগ করা হয় যাতে খাদ্যের shelf life বৃদ্ধি পায়। এই ট্র্যানস ফ্যাট সাধারনত: বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদিত ভাজা জাতীয় খাদ্যে এবং যে সব খাদ্য hydrogenated oils দিয়ে তৈরি করা হয় – ঐসব খাদ্যে সচারাচরভাবে বেশী পাওয়া যায়।

এদের প্রদাহ সৃষ্টির গুনাগুন থাকায় এই ধরণের চর্বি খাওয়ার ফলে বিভিন্ন রকম স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দেয় যার মধ্যে খারাপ কোলেস্টেরল এবং হৃদরোগ অন্তর্ভূক্ত।

ট্র্যানস ফ্যাট খেলে রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রাও বেড়ে যায়। অনেক গবেষণা থেকে এর প্রমান পাওয়া গিয়েছে।

মুল কথা হল, ট্র্যানস ফ্যাটযুক্ত খাদ্য গ্রহণের দ্বারা আপনার রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়ে যাবে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হবে। এজন্য, খাদ্য তালিকা থেকে এটিকে বর্জন করা চাই।

চর্বিযুক্ত মাছ বা ফ্যাটি ফিস খাওয়ার মাধ্যমে

সপ্তাহে কমপক্ষে দু’বার চর্বি বিশিষ্ট মাছ খাওয়ার অভ্যাস গড়ুন। ফ্যাটি ফিস রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড কমানোসহ হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর কারণ, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড যা এই ধরণের মাছে বিদ্যমান থাকে।

ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড হল এক প্রকারের পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড যা মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়। আর প্রয়োজনীয় বা essential fatty acid তাকেই বলে যেগুলো আপনাকে খাদ্যের সাথে গ্রহণ করতে হবে। আপনার শরীর তা উৎপাদন করতে পারে না।

ফ্যাটি ফিসের উদাহরণ হল- স্যালমন (salmon), হ্যারিং (herring), সারডিনস (sardines), টুনা (tuna), ম্যাকারেল (mackerel) ইত্যাদি।

সার কথা হল –ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ খাবারের খুব ভাল উৎস হল চর্বিযুক্ত মাছ। এটি আপনাকে সপ্তাহে দু’বার খেতে হবে। তাহলে, আপনার হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যাবে এবং রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রাও কমে যাবে।

আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি খেয়ে

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট আপনার রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কামাতে পারে। বিশেষ করে, আপনার খাদ্য তালিকায় যদি এই ধরণের ফ্যাটের পরিবর্তে অন্য ধরণের বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট অন্তর্ভূক্ত থাকে।

মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট অলিভ ওয়েল, নাটস, অ্যাভোকেডোস ইত্যাদিতে পাওয়া যায়। পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট সাধারণত: সবজি তৈল (vegetable oil) এবং চর্বিযুক্ত মাছে পাওয়া যায়।

খাদ্যে সয় (soy) প্রোটিন অন্তর্ভুক্ত করে

গবেষণায় দেখা যায়, আপনার রক্তের ট্রাই গ্লিসারাইড কমাতে সয় প্রোটিন খুব গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাহলে, চলুন জেনে নেই – সয় প্রোটিন জিনিসটি আসলে কি। আপনি নিশ্চয়ই সয়াবিন তেল সম্পর্কে জানেন।

সয় প্রোটিন এমন প্রোটিন যা সয়াবিন গাছ থেকে সংগৃহিত হয়।

ন্যাচারাল সাপ্লিমেন্ট খেয়ে

ফিস ওয়েল : হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এর ভূমিকার বিষয়ে এটি খুব সুপরিচিত। এক গবেষণায় জানা যায়, ফিস ওয়েল সাপ্লিমেন্ট রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড ৪৮% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।

তাহলে, বন্ধুগন, ট্রাইগ্লিসারাইড কমানোর উপায় সম্পর্কে ইতোমধ্যে একটি ধারণা পেয়ে গেছেন। এবারে যা করতে হবে, তা হলো, ব্যাক্তিগত জীবনে উপরে বর্ণিত উপায় গুলো মেনে চলা।