মুরগি পালন: কিভাবে মুরগির খামার ব্যবসায় লাভ করা যায়?

আপনি কি একজন শিক্ষানবিস হিসাবে মুরগি পালন এর উপর একটি গাইড খুজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন?

হ্যা, সত্যিই যদি আপনি নতুনভাবে মুরগির খামার স্থাপন করতে চান এবং এর উপর নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য খুজে পাওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে আপনি সঠিক জায়গা খুজে পেয়েছেন, এই পোষ্টটি আপনার জন্য।

কিভাবে আপনি মুরগি পালন নিয়ে ব্যবসা শুরু করে সফল হতে পারেন, তার উপর প্রয়োজনীয় তথ্যসমুহ গাইড আকারে আপনাদের নিকট উপস্থাপন করছি।

এক মিনিট!

আপনি নিচের ৩টি ক্যাটাগরির মধ্যে হয়ত কোন একটিতে রয়েছেন;

  • মুরগির খামার ব্যবসা সম্পর্কে একেবারেই নতুন।
  • এক সময়ে আপনি কিছু মুরগি কিনেছিলেন পালন করার জন্য, কিন্তু এর অধিকাংশই মারা গিয়েছে।
  • আপনি পোল্ট্রি বিষয়ক কোন লাভজনক ব্যবসা খুজছেন অর্থ বিনিয়োগের জন্য।

আপনি এই তিনটির মধ্যে যে পর্যায়েই থাকুন না কেন বাস্তবিক অর্থে এটি কোন বিষয় নয়। সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ বিষয় হল, সঠিক তথ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা যা আপনাকে আপনার গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে।

পোল্ট্রি পালন যে একটি লাভজনক ব্যবসা তা কারোর অজানা নয়।

মুরগির খামার স্থাপনের নিয়ম পদ্ধতি উপর ধারাবাহিকভাবে এখানে যে সব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, আপনি যদি সেগুলো মেনে অগ্রসর হতে পারেন তাহলে আশা করা যায় আপনি লাভবান হবেন।

তাহলে, মুল আলোচনায় চলে যাই।

মুরগি পালন বা পোল্ট্রি ফার্মি কি?

বাণিজ্যিকভাবে ডিম, মাংস ও পালক উপাদনের জন্য বিভিন্ন ধরণের গৃহপালিত বার্ডস পালন করাই হল পোল্ট্রি ফার্মি।

পোল্ট্রি পালনের উপর শিক্ষানবিসদের জন্য এই গাইডে আমি পোল্ট্রির মধ্যে মুলত মুরগি পালন বিষয়ে ফোকাস করে আলোচনা করব।

এখন, প্রশ্ন করতে পারেন, কেন আমি মুরগিকে বেছে নিলাম?

এর কারণ – মুরগি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমনি সারা বিশ্বেও সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সহজলভ্য। এটি তুলনামুলক দামে কম এবং সহজে পালন করা যায়।

মুরগির মাংস এবং ডিম প্রাণিজাত আমিষের প্রধান উৎস উৎস যা আমাদের খাদ্য এবং পুষ্টি নিরাপত্তায় ব্যপকভাবে অবদান রাখছে।

মুরগির খামার কি একটি লাভজনক ব্যাবসা?

Agribusiness এর মধ্যে পোল্ট্রি ফার্মি খুবই লাভজনক একটি ব্যবসা।

কিন্তু, আপনাকে জানতে হবে, সঠিক ব্যবস্থাপনা যা কেবল মেনে চলতে পারলেই আপনি এ যাত্রায় সফল হতে পারবেন। অন্যথায় নয়।

এছাড়া, আপনার খামারের উপাদিত ডিম বা মাংসের বাজরজাতকরণের দিকেও রাখতে হবে সজাগ দৃষ্টি। যাতে সময় হয়ে গেলে বিক্রির জন্য অপেক্ষা করতে না হয়।

এরকম আকাঙ্খা প্রত্যেক খামারির ভিতর থাকে যে – খামারের উপাদিত পণ্য যাতে যথা সময়ে উপযুক্ত দামে বিক্রি করা যায়।

ছোট পর্যায়ের খামারির জন্য বিক্রি করা তেমন কঠিন বিষয় নয়। কিন্তু বড় মাপের বাণিজ্যিক খামারের বেলায় উৎপাদিত ডিম বা মাংস একসাথে বিক্রি করা অনেক সময় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়াতে পারে।

তাই, মার্কেটিং এর যথাযথ পরিকল্পনা নিয়েই আগাতে হবে।

কাজেই, পোল্ট্রি ব্যবসায় লাভ করতে হলে সবকিছু মাথায় রেখে একটি সঠিক কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে আগাতে হবে যাতে সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কোন ত্রুটি না থাকে।

নতুনদের জন্য মুরগির খামার স্থাপন

অনেকের মনেই পশ্ন থাকে – কিভাবে নতুন অবস্থায় মুরগির খামার ব্যবসা শুরু করা যায়। কিন্ত এর উত্তর একটিই।

তা হল – আপনি একটি পোল্ট্রি ফার্মিং এর খুটি-নাটি সবকিছু তারাতারি রপ্ত করতে পারবেন না। বিষয়টির মধ্যে কিছুটা হলেও ব্যাপকতা আছে।

তবে, সর্বপ্রথম আপনাকে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যা পোল্ট্রি সম্পর্কিত বিভিন্ন গাইড, আর্টিকেল, বই ইত্যাদি পড়ার দ্বারা অর্জন হবে। এর মাধ্যমে, আপনি পোল্ট্রি ফার্মি সম্পর্কে একটি প্রাথমিক একটি ধারণা পাবেন।

দ্বিতীয় ধাপে, আপনি স্বশরীরে কয়েকটি খামার ভিজিট করবেন। দেখে নিবেন তারা কিভাবে সবকিছু করছে। এর ফলে, তাত্ত্বিক জ্ঞানের সাথে ব্যবহারিক জ্ঞান যোগ হবে।

এবার, আপনি যখন পোল্ট্রি ফার্মি শুরু করবেন, তখন নিজে কাজ করে শিখবেন। এভাবেই চলতে থাকবে। যত দিন যাবে তত অভিজ্ঞ হবেন। কিন্তু জানা ও শেখার কোন শেষ নেই। এই মানুষিকতা নিয়ে চলতে হবে।

মুরগির খামার স্থাপনের মুলনীতি

আপনি ডিম উৎপাদন বা মংস উৎপাদন যে উদ্দেশ্যেই পোল্ট্রি খামার চালু করেন না কেন, কিভাবে পোল্ট্রি পালন করলে তা লাভজনক পর্যায়ে যেতে পারে তার মুলনীতি আপনাকে জানতে হবে ও বুঝতে হবে।

কাজেই, পোল্ট্রি খামার স্থাপনের পূর্বে আপনাকে এর উপর যত দুর সম্ভব পড়াশুনা করতে হবে এবং প্রশিক্ষণ নিতে হবে। সবচেয়ে ভাল হয়, ইনটার্ন বা যে কোন পর্যায়ে পোল্ট্রি ফার্মে যদি কাজ করতে পারেন।

এর ফলে, পোল্ট্রি ফার্মিং এর উপর অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।

যারা পোল্ট্রি ব্যবসায় নেমে ক্ষতির স্বীকার হয়েছে, তাদের সম্পর্কে তথ্য যোগার করুন- কেন তারা ক্ষতিগ্রস্থ হল।

আবার যারা লাভবান হচ্ছে, তাদের ব্যাপারেও খবর নিন – কিভাবে পালন করার মাধ্যমে বা কি কি নিয়ম নীতি অনুসরণ করার ফলে তারা লাভবান হল।

অনেক পোল্ট্রি খামারি বিশেষ করে যারা নতুন অবস্থায় শুরু করে তাদের মধ্যে কেউ কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হয় কারণ তারা পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে সঠিকভাবে মুরগির খামার পরিচালনায় ব্যর্থ হয়।

অনেক খামারি খুজে পাওয়া যাবে যাদের খামার পরিচালনার কোন সুনির্দিষ্ট কর্ম পরিকল্পনা থাকে না। যা যেকোন ব্যবসার জন্যই থাকা উচিত।

একজন পোল্ট্রি খামারি হিসাবে আপনার খামার ব্যবস্থাপনার অবশ্যই একটি পরিকল্পনা থাকতে হবে, যে কখন কি করবেন বা কিভাবে খামার পরিচালিত হবে। এই কর্ম পরিকল্পনাই আপনাকে পথ দেখিয়ে সামনের দিকে নিয়ে যাবে।

এই পরিকল্পনা মোতাবেক আপনাকে খামার ব্যবস্থাপনার সবকিছু সময়মত সঠিকভাবে করতে হবে।

যাহোক, এত সব কিছু পরিকল্পনা মাফিক করতে গেলে আপনাকে ধৈর্যশীল হতে হবে। আর এই ধৈর্যকে যদি hobby হিসাবে নিতে পারেন, তাহলে পথ চলা অনেকটা সহজ হয়ে যাবে।

কিভাবে একটি পোল্ট্রি খামার শুরু করবেন?

বাংলাদেশে একটি পোল্ট্রি ফার্ম শুরুর পূর্বে প্রথমেই আপনাকে নিচের কাজগুলি করতে হবে-

  • আপনার নিকটস্থ খামারে গিয়ে দেখে আসুন তারা কিভাবে খামার পরিচালনা করছে।
  • কোন ধরণের পোল্ট্রি পালন করবেন তা ঠিক করুন। যেমন হতে পারে – ব্রয়লার, লেয়ার, ককরেল ইত্যাদি।
  • ফার্মের স্থান নির্বাচন করুন।
  • লেয়ার খামারের বেলায় পোল্ট্রি cage বা খাচা সেট করুন।
  • খামারের যন্ত্রপাতি ও ব্যবহার্য সামগ্রি ক্রয় করুন।
  • ভাল হ্যাচারি বা তাদের সরবরাহকারি থেকে এক দিন বয়সি বাচ্চা ক্রয় করুন।
  • খাদ্যের ব্যাবস্থা করুন – নিজে বানিয়ে অথবা রেডি ফিড ক্রয় করে।
  • পোল্ট্রির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা প্রোগ্রাম সঠিকভাবে মেনে চলুন।
  • আপনার পোল্ট্রি অথবা পোল্ট্রি পণ্য বাজারজাত করুন।

এবারে এক এক করে এদের বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হল।

নিকটস্থ মুরগির খামার থেকে শিক্ষা গ্রহন

অনেক লোক এমন আছে যারা শোনা কথার উপর ভিত্তি করে সরাসরি খামার স্থাপন করে ব্যবসা শুরু করে দেয়। যাদের বেশীরভাগ লোকের ক্ষেত্রে পরে অনুতাপ করা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।

অথচ খামার স্থাপন করে পোল্ট্রি ব্যবসা পরিচালনা করা তেমন সহজ কাজ নয়। এখানে অনেক সূক্ষ্ম বিষয় থাকে, যা সঠিকভাবে মেনে চলতে পারলেই আপনি লাভবান হতে পারেন।

যেমন, এক দিন বয়সি বাচ্চার ব্রুডিং এর কথাই ধরুন। যদি সঠিকভাবে তাপমাত্রা সহ অন্যান্য বিষয়গুলি অনুসরণ করার ব্যাপারে উদাসিন থাকেন, তাহলে এমনও হতে পারে যে ঘুম থেকে উঠার আগেই সব মরে শেষ।

কাজেই, মুরগির খামার স্থাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর পরই আপনার কাজ হবে, পোল্ট্রি পালনের উপর যথাযথ তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয়ভাবেই প্রশিক্ষণ লাভ করা।

সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে এ ধরণের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। আপনি কিভাবে প্রশিক্ষণ পেতে পারেন সে বিষয়ে আপনার নিকটস্থ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে গিয়ে যোগাযোগ করুন। সেখান থেকে সব তথ্য পেয়ে যাবেন।

এর বাইরে, যারা দীর্ঘদিন ধরে সফলতার সাথে পোল্ট্রি খামার চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সাথে কথা বলে ও খামারে যোগাযোগ করে বাস্তব জ্ঞান লাভ করুন।

এভাবে, প্রশিক্ষণ লাভের পর আপনি এক দিন বয়সের পোল্ট্রি কিভাবে ব্রুডিং করতে হয় তা জানতে পারবেন এবং পোল্ট্রি পালনের অন্যান্য  প্রাসঙ্গিক বিষয় সম্পর্কেও ধারণা পেয়ে যাবেন।

পোল্ট্রি ব্যবসার ধরণ নির্বাচন

পোল্ট্রি সম্পর্কিত ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগের অনেক ক্ষেত্র আছে। এর মধ্য থেকে আপনি কোন ধরণের ব্যবসা শুরু করতে চান, তা ঠিক করে নিতে হবে। যেমন, নিচে কয়েকটি ব্যবসার নাম উল্লেখ করা হল:

  • মাংস উৎপাদনের জন্য ব্রয়লার
  • ডিম উৎপাদনের জন্য লেয়ার
  • ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের জন্য হ্যাচারি
  • পোল্ট্রি খাদ্য উৎপাদন
  • পোল্ট্রি খামার যন্ত্রপাতি উৎপাদন
  • পোল্ট্রি মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ

উপরোক্ত ক্যাটাগরি থেকে যেটাই আপনি বেছে নেন না কেন সে অনুযায়ী আপনার বিনিয়োগ করার মত প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা আপনার পক্ষে সম্ভব হবে কিনা তা মাথায় রাখতে হবে।

তবে, আপনি যদি সর্বপ্রথম পোল্ট্রি ব্যবসা শুরু করতে চান, তাহলে মাংস উৎপাদনের জন্য ব্রয়লার এবং ডিম উৎপাদনের জন্য লেয়ার খামার স্থাপন করা আপনার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।

কারণ, এখানে অর্থ বিনিয়োগের পরিমান তুলনামুলক কম হবে।

এর বাইরে, আরেকটি বিষয় ভাবতে হবে – আপনার খামারের ধারণ ক্ষমতা কেমন হবে? অর্থাৎ, কত সংখ্যক ব্রয়লার বা লেয়ার পালন করতে চান – তা আপনাকে নির্ধারণ করে নিতে হবে।

কারণ, খামার ক্যাপাসিটি নির্ভর করে কি পরিমান অর্থ বিনিয়োগ করতে পারবেন তার উপর।

এক্ষেত্রে, আপনাকে একজন এক্সপার্টের সাথে আলাপ করে নিতে হবে। যাতে আপনি আপনার সামর্থ অনুযায়ী সঠিক ভাবে অগ্রসর হতে পারেন। অন্যথায়, মুরগির খামার ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

পোল্ট্রি খামারের স্থান নির্বাচন

আপনার পোল্ট্রি ব্যবসা যাত্রায় স্থান নির্বাচন পোল্ট্রি খামার স্থাপনের জন্য খুব গুরত্বপূর্ণ একটি কাজ। নিম্নলিখিত বিষয় বিবেচনায় রেখে স্থান নির্বাচন করা উচিত-

  • মহাসড়কের সাথে যোগাযোগ
  • পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা
  • চিকিৎসা সুবিধা
  • বৈদ্যুতিক সরবরাহ লাইন
  • পানি সরবরাহ
  • উচু ভূমি যেখানে বৃষ্টি বা বন্যার পানির প্রভাব না থাকে
  • বিপননের জন্য মার্কেটের সহজলভ্যতা

আবাসিক এলাকায় খামার স্থাপন করা আইনত বৈধ নয়। কারণ, খামার থেকে যে দুর্গন্ধ তৈরি হয়, তা আবাসিক এলাকায় বসবাসরত মানুষের জন্য কষ্টকর। আবার, বাণিজ্যিক এলাকায় ভূমি সহললভ্য নয়, ব্যায়বহুল।

কাজেই, আপনাকে ঐসব জায়গা নির্বাচন করতে হবে যেখানে ভূমির সহজ প্রাপ্যতা থাকে এবং একই সাথে উপরোক্ত সুবিধাদিও বিদ্যমান থাকে।

তবে, আপনি শহর ও বাণিজ্যিক এলাকা থেকে দুরের কোন জায়গা বেছে নিতে পারেন। এতে করে ভূমি এবং শ্রমিক কম দামে পাওয়া যাবে।

তার মানে এই নয় যে, এমন দুরে কোন জায়গা বেছে নিলেন যেখান থেকে পোল্ট্রিজাত পণ্য আনা-নেওয়ার কাজে যাতায়ত খরচ একটি ইস্যু হয়ে দাড়ায়।

পোল্ট্রির বাসস্থান নির্মাণ

আপনার খামারের উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন হয়ে গেলে পরবর্তি কাজ হল বাসস্থান নির্মান। বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে এ কাজটি আপনাকে সেরে নিতে হবে।

বাসস্থান নির্মাণ কাজ শুরুর পূর্বে আমি জোড়ালোভাবে আপনাকে অনুরোধ করব – আপনি কয়েকটি মুরগির খামার পরিদর্শন করে আসুন। দেখে আসুন বিদ্যমান খামার গুলির বাসস্থান কিভাবে নির্মাণ করা হয়েছে।

বিশেষ করে, আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ি যে ধারণ ক্ষমতার খামার স্থাপন করবেন, ঐরকম ক্যাপাসিটি বিশিষ্ট কয়েকটি খামার পরিদর্শন করুন। এর মাধ্যমে বাস্তব ভিত্তিক ধারণা পাবেন।

আপনি বিভিন্ন ভাবে পোল্ট্রির ঘর নির্মাণ করতে পারেন। পোল্ট্রির জন্য একটি আদর্শ বাসস্থানের বৈশিষ্ট হল – পোল্ট্রি যাতে আরামদায়ক পরিবেশে বসবাস করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করে বাসস্থান তৈরি করতে হবে।

ঝর, বৃষ্টি, রোদ ইত্যাদি প্রাকৃতিক বৈরি আবহাওয়া যাতে কোন প্রকার ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করতে না পারে সে দিকে খেয়াল করে ঘর তৈরি করতে হবে।

পোল্ট্রি হাউস কত প্রকার?

পোল্টির বাসস্থান সাধারণত: তিন প্রকারের হতে পারে। যেমন-

  • এক্সটেনসিভ : এই ভাবে পোল্ট্রি মুক্ত হয়ে বিচরণ করতে পারে।
  • সেমি-ইনটেনসিভ : এক্ষেত্রে, মাঝামাঝি অবস্থান। অর্থাৎ মুক্ত এবং আবদ্ধ অবস্থার মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকে।
  • ইনটেনসিভ : এই পদ্ধতিতে পোল্ট্রি সম্পূর্ণরুপে আবদ্ধ অবস্থায় থাকে। নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকে।

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পোল্ট্রি পালনের জন্য ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে পোল্ট্রি পালন করা শ্রেয়।

পোল্ট্রি পালন পদ্ধতি

আপনি দুই পদ্ধতিতে পোল্ট্রি পালন করতে পারেন।

  • মেঝের উপর পালন (deep liter) পদ্ধতি: যদি আপনি মাংস উৎপাদনের লক্ষ্যে ব্রয়লার পোল্ট্রি পালন করতে চান, তাহলে এই পদ্ধতি ভাল হবে।
  • খাচায় পালন (cage system) পদ্ধতি : যদি আপনি ডিম উৎপাদনের উদ্দেশ্যে লেয়ার মুরগি পালন করতে চান, তাহলে এই পদ্ধতি বেছে নিতে পারেন।

পোল্ট্রি পালনে মেঝের হিসাব (floor space)

পোল্ট্রি ইকুইপমেন্ট

পোল্ট্রি খামার ব্যবস্থাপনায় পোল্ট্রি ইকুইপমেন্ট আপনার কাজ অনেক সহজ করে দিবে। এগুলোর মাধ্যমে আপনি পোল্ট্রিকে কোন প্রকার দুষণ ব্যাতিরেকে মান সম্পন্ন খাবার এবং পানি সরবরাহ করতে পারেন।

একটি মুরগির খামার পরিচালনা করতে গিয়ে আপনার অনেক ধরণের ইকুইপমেন্টের প্রয়োজন হবে। যার সবগুলিই খামার ব্যবস্থাপনায় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নিচে প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্টসমুহের নাম উল্লেখ করা হল=

  • Feederer: এর মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ করা হয়।
  • Waterer: আপনি এই ডিভাইসের মাধ্যমে পোল্ট্রিকে পানি সরবরাহ করতে পারেন।
  • Nests: এটি হল মুরগির ডিম দেওয়ার জায়গা। যা আলাদাভাবে প্রস্তুত করা হয়। তবে, লেয়ার পালনে যে খাচা ব্যবহৃত হয় সেখানে এটি তৈরি করা থাকে।
  • ভেন্টিলেশন সিস্টেম: এর মাধ্যমে খামারে বাসস্থানের ভিতর পর্যাপ্ত বাতাস আসা যাওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। পোল্ট্রির ঘরের ভিতর অনেক দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। এই দুর্গন্ধ দুর করতে আপনি odour vents ব্যবহার করতে পারেন।
  • Cages : এটি হল খাচা যা লেয়ার পোল্ট্রি পালনে ব্যবহৃত হয়। পোল্ট্রি হাউসের একদিক থেকে অপরদিক পর্যন্ত লম্বালম্বিভাবে খাচা বসানো হয়। যা স্তরে স্তরে বিন্যস্ত থাকে। এক এক পোল্ট্রির জায়গার প্রয়োজন অনুযায়ি খাচার ভিতর এক এক প্রকোষ্ঠ পৃথক পৃথক অবস্থায় থাকে। যেখানে এক একটি প্রকোষ্ঠে একটি করে লেয়ার মুরগি রাখা হয়।
  • Preches: মেঝের কিছু উপরে এটি তৈরি করা হয়। যার উপর বসে মুরগির বিশ্রাম নেয়।
  • Brooder বা heater: এক দিন বয়সি বাচ্চা হ্যাচারি থেকে খামারে আনার পর এই ডিভাইসের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে তাপ সরবরাহ করা হয়। বাচ্চার বয়স যত বাড়তে থাকে, তাপ সরবরাহের পরিমান তত কমতে থাকে। প্রথম সপ্তাহে প্রায় ৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। দ্বিতীয় সপ্তাহে ৯০ ডিগ্রি, তৃতীয় সপ্তাহে ৮৫ – এভাবে আস্তে আস্তে কমতে থাকে।
  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম: পূর্বে বলা হয়েছে, পোল্ট্রি খামার পরিচালনায় পোল্ট্রির বিষ্ঠা থেকে এমোনিয়া গ্যাসসহ অনেক দুর্গন্ধের তৈরি হয়। লিটার পদ্ধতিতে পালন করলে লিটারের উপর বিষ্ঠা লেগে থাকে। ফলে কয়েক সপ্তাহ পর তা ড্যাম বা স্যাতস্যাতে হয়ে যায়। তখন এটি পরিবর্তন করে নতুন লিটার দিতে হয়। যাতে পোল্ট্রিসমুহ আরামদায়ক ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে পারে।

বিষয় হল, লিটার পরিবর্তনের সময় এগুলো যথাযথভাবে dispose করার জন্য আপনার একটি বিজ্ঞানসম্মত বর্জ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম থাকতে হবে। যার মাধ্যমে আপনি খামারে উৎপাদিত সমুদয় বর্জ্য সঠিকভাবে dispose করতে পারেন।

  • আলো সরবরাহ: লেয়ার পালনের সময় বয়স ভেদে আলো সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হয় যাতে তা সময়মত ডিম উৎপাদনের উপযোগী হয়।
  • ডিমের ট্রে: লেয়ার খামারে ব্যবহৃত হয়।

একদিন বয়সি বাচ্চা ক্রয়

খামারের বাসস্থান নির্মাণের পর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হয়ে গেলে – আপনার কাজ হবে পোল্ট্রি হ্যাচারি অথবা তাদের ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরবরাহকারি থেকে এক বয়সের বাচ্চা ক্রয় করা।

বাচ্চা সংগ্রহের কাজটি খুব সতর্কতার সাথে করতে হবে। এখানে বাচ্চার গুনগত মানের দিকে গুরত্ব দিতে হবে। এজন্য, এমন হ্যাচারি থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করতে হবে যারা বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে ভাল মানের বাচ্চা উৎপাদন করে তা সরবরাহ করে যাচ্ছে।

অসুস্থ, রোগাক্রান্ত সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকুন। কেননা, এতে মৃত্যুর হার স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যেতে পারে।

একটি খামার পরিচালনায় স্বাভাবিক মৃত্যুর হার ধরে নেওয়া হয় সর্বোচ্চ ৫%।

বাচ্চা ক্রয় করে খামারে আনার পূর্বেই ব্রুডিং এর জন্য সবকিছু ঠিক করা আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, একদিন বয়সি বাচ্চা খামারে আনার সঙ্গে সঙ্গেই তার ব্রুডিং হাউজে রাখতে হবে।

আপনি যদি, পোল্ট্রি পালনে একেবারেই নতুন হয়ে থাকেন বা এ বিষয়ে আপনার বাস্তব কোন অভিজ্ঞতা না থাকে, তাহলে প্রথম টার্মে সর্বোচ্চ ৫০০ টি বাচ্চা দিয়ে শুরু করতে পারেন।

এভাবে পর পর কয়েকটি ব্যাচ অতিক্রম হওয়ার পর আপনার অভিজ্ঞতা হয়ে যাবে। তারপর বেশী পরিমানে বাচ্চা পালন করতে কিছুটা হলেও সাহস সঞ্চার হবে।

কর্মি নিয়োগ

মুরগির খামার এর সমুদয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য খামার কর্মির প্রয়োজন হবে। আপনি যদি পোল্ট্রি পালনে সম্পূর্ণভাবে নতুন হয়ে থাকেন, তাহলে ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কর্মি নিয়োগ করা প্রয়োজন।

খামারের ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ি কর্মির সংখ্যা ঠিক করতে হবে। তবে, নতুন অবস্থায় যেহেতু কম সংখ্যক বাচ্চা দিয়ে শুরু করা ভাল, তাই প্রথম পর্যায়ে আপনি একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কর্মি নিয়োগ দিলে হয়ে যাবে।

৫০০টি বাচ্চার কোন পোল্ট্রি খামার একজন কর্মি দিয়ে চালানো যাবে।

পোল্ট্রি খাদ্য

উপরের আলোচনা পর্যন্ত – পোল্ট্রি হাউজ নির্মাণ এবং প্রয়োজনী সব ইকুইপমেন্ট ক্রয় করার পর যখন একদিন বয়সের বাচ্চা খামারে উঠাবেন তখন খাওয়ানোর প্রশ্ন আসবে।

অন্যান্য গবাদিপশুর খামারের মত, পোল্ট্রির ক্ষেত্রে খাদ্যের ব্যবস্থা করা সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ কাজ। কারণ, খামার পরিচালনায় যত খরচ হবে তার প্রায় ৭০% অর্থ খাদ্যের পিছনে ব্যয় হবে।

আপনার খামারের সফলতা বহুলাংশে নির্ভর করবে দু’টি বিষয়ের উপর। একটি মান সম্পন্ন বাচ্চা ও অপরটি ভাল মানের খাদ্য।

পোল্ট্রি খাদ্য সাধারণত: পোল্ট্রি ফিড নামে পরিচিত। আপনি দু’ ভাবে এই ফিডের ব্যবস্থা করতে পারেন-

  • পিলেট ফিড
  • সাধারণ ফিড

পিলেট ফিড: এই ধরণের পোল্ট্রি ফিড ফিড-মিল থেকে উৎপাদিত হয়। উৎপাদনের পর ৫০ কেজি প্যাকেট প্যাকেটিং করে বাজারজাত করা হয়।

মুরগির বয়স অনুযায়ি পিলেট ফিড আবার কয়েকভাগে বিভক্ত। যেমন-

  • স্টার্টার : এক দিন বয়স থেকে এই ফিড খাওয়ানো শুরু হয়।
  • গ্রোয়ার : সাধারনত: তৃতীয় সপ্তাহ থেকে খাওয়াতে হয়।
  • ফিনিশার: চতুর্থ সপ্তাহ থেকে খাওয়ানো হয়।
  • ব্রিডার : যে সব মুরগির উৎপাদিত ডিম বাচ্চ ফুটানোর কাজে ব্যবহৃত হয়, ঐ সব লেয়ার মুরগিকে খাওয়ানো হয়।

সাধারণ ফিড: এগুলো ফিড-মিলে উৎপাদিত হয় না। খাদ্যের ছয়টি উপাদানসমুহ এক এক করে আপনি বাজার থেকে ক্রয় করবেন, তারপর ভালভাবে মিশিয়ে সুষম খাদ্য তৈরি করে পোল্ট্রিকে খাওয়াবেন।

এই ধরণের খাদ্যে খরচ কম হয়। তবে, যদি আপনি নতুনভাবে শুরু করতে চান তাহলে আপনি ফিড-মিলে প্রস্তুতকৃত পিলেট খাবার দিয়ে প্রথম কয়েকটি ব্যাচ পার করাতে পারেন।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা

পোল্ট্রি খামারে মুরগি মরে যাওয়ার ঘটনা – অনেকটা সাধারণ ঘটনার মত। খামার পরিচালনা করতে গিয়ে বিভিন্ন বয়সে পোল্ট্রি মারা যেতে পারে।

তবে, স্বাভাবিক মৃত্যুর হার ৫%। যদি মৃত্যুর হার ৫% এর অধিক হয়, তখন এটি অস্বাভাবিক পর্যায়ে চলে যায়। আর, এই অস্বাভাবিক ‍মৃত্যুর কারণ একটি বা দু’টি নয়, নানাবিধ কারণে মারা যেতে পারে।

এজন্য খামার পরিচালনায় প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দিকে আপনাকে খুব নজর দিতে হবে। পোল্ট্রি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা আপনার ব্যবসায়িক সফলতার মুল ভিত্তি হিসাবে পরিগনিত।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসাবে বেশ কয়েকটি বিষয় আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে, যেমন-

  • জীব নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা;
  • সময়মত টিকা প্রদান : যেমন রাণিক্ষেত, গামবোরে, সালমোনেলা, কক্সিডিওসিস ইত্যাদি;
  • পরিস্কার ও জীবানুমুক্ত পানি সরবরাহ;
  • সঠিকভাবে লিটার ব্যবস্থাপনা;
  • চিকিৎসকের পরামর্শে অন্যান্য মেডিকেশন;

আমরা সকলেই একটি প্রবাদ বাক্য সম্পর্কে জানি, তা হল “আরোগ্যের চেয়ে রোগ প্রতিরোধ ব্যাবস্থা ভাল।” ইংরেজিতে বলা হয়, “Prevention is better than cure”.

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে আপনাকে অবশ্য সময়মত টিকা প্রদান করতে হবে।

উপসংহার

মুরগির খামার স্থাপনের এই প্রারম্ভিক গাইড শুধুমাত্র একটি ধারণা লাভের জন্য। বাস্তবতা খামার স্থাপনের পর খামার পরিচালনার সময় অনুধাবনযোগ্য।

সর্বদা আপনার নিকটস্থ সফল পোল্ট্রি খামারির সাথে যোগাযোগ রাখুন এবং তাদের পোল্ট্রি খামার কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে চলুন।

যদি আপনি একেবারেই নতুন হয়ে থাকেন, তাহলে প্রথমে ছোট আকারের খামার দিয়ে যাত্রা শুরু করুন। তারপর সফলভাবে কয়েকটি ব্যাচ অতিক্রমের পর আস্তে আস্তে খামারের ক্যাপাসিটি বড় করুন।

সুষ্ঠভাবে খামার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার স্বার্থে পোল্ট্রি এক্সপার্ট ও অভিজ্ঞ খামারির সহায়তায় একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন করুন যা আপনাকে পথ নির্দেশ করবে।

আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে কমেন্ট সেকশনে প্রশ্ন করুন। আমি যথাসাধ্য উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।

এই আর্টিকেলের তথ্য সমুহ যদি আপনার নিকট প্রয়োজনীয় মনে হয় তাহলে পরবর্তি পোষ্টের নোটিফিকেশন পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন এবং সেখানে শেয়ার করুন।

 

2 thoughts on “মুরগি পালন: কিভাবে মুরগির খামার ব্যবসায় লাভ করা যায়?”

  1. আমি বাণিজ্যিকভাবে করতে চাই। যেহেতু আমি নতুন তাই প্রথমে 500 মুরগির বাচ্চা দিয়ে শুরু করতে চাই। তার জন্য কত বাই কত ঘর বা সেড তৈরি করতে হবে।
    বিশেষ করে আমাকে 500 মুরগির লাভ এবং লস এর চ্যাপ্টার একবার দেখিয়ে দিলে অনেক উপকৃত হব।

    • ধন্যবাদ আপনার আগ্রহের জন্য। নতুন হিসাবে ৫০০ মুরগি দিয়ে শুরু করা – এটি আপনার ভাল সিদ্ধান্ত। ২০ বাই ৩০ হলে ভাল হয়।

Comments are closed.