চা পাতার ব্যবসা : স্বল্প পুঁজির একটি খুবই লাভজনক ব্যবসা।

চা পাতার ব্যবসা হতে পারে আপনার জন্য স্বল্প পুঁজির একটি লাভজনক ব্যবসা যদি আপনি সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে পারেন। আমাদের দৈনন্দিন নিত্য প্রয়োজনিয় খাদ্য তালিকা চা হল একটি উত্তম পানিয়। সারা বিশ্বব্যাপি চা খুবই জনপ্রিয় একটি খাদ্যের নাম।  আমাদের দেশেও ধনি-গরিব, শহর-গ্রাম নির্বিশেষে চা একটি অত্যান্ত পরিচিত এবং সমাদৃত জিনিসের নাম। অথচ এই রকম একটি বিষয়ের উপর ব্যবসা করার যে সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র রয়েছে তা নিয়ে আমরা অনেকেই চিন্তা করিনা। আমাদের একটি বদ্ধমুল ধারনা যে ব্যবসা করতে অনেক টাকা লাগে। তাই, এদেশের তরুণ জনগোষ্ঠি কোনরকম পর্যায়ে লেখাপড়া শেষ করেই চাকরি পিছনে ছুটে। তারা উদ্যোক্তা হওয়ার মানষিকতা হারিয়ে ফেলে।

কিন্তু স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করেও আস্তে আস্তে ছোট থেকে বড় এবং সফল একজন উদ্যোক্তা হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। দরকার হল সঠিক পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনিয় তথ্য সরবরাহ। তাই, দেশের ক্রমবর্ধমান বেকার জনগোষ্ঠিকে চা পাতার ব্যবসা  কিভাবে শুরু করা যায় তা নিয়েই আজকের এই আয়োজন। মনে রাখবেন, আপনি চাকরির পিছনে না ছুটে একজন সফল উদ্যোক্তা হতে পারলে আরও দশজনকে চাকরি দিতে পারবেন। এভাবেই আস্তে আস্তে একসময় দেশের প্রত্যেক মানুষই কর্মমুখি হওয়ার অনুপ্রেরণা পাবে। তখন, বেকার জনগোষ্ঠি দেশের জন্য বা পরিবারের জন্য আর বোঝা হয়ে থাকবে না। তারা মানব সম্পদে পরিণত হয়ে যাবে। যাহোক, আর কথা না বাড়িয়ে আসুন চলে যাই মুল আলোচনায়।

চা পাতা ব্যবসার বাজার সম্ভাবনা কেমন?

কোন পণ্যের কনজিউমার যদি ধনি, গরিব নির্বিশেষে সকলেই হয়, তাহলে বলার অপেক্ষা রাখেনা ঐ পণ্যের বাজার সম্ভাবনা কেমন হতে পারে। চা পাতার ব্যবসা এই ধরণের পণ্য নিয়েই একটি ব্যবসা।  বাংলাদেশে চা উৎপাদন শুরু হয় ১৮৪০ খ্রি: থেকে। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সুত্র মতে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে চা উৎপাদনের পরিমান ছিল ৮০ মিলিয়ন কিলোগ্রাম। ইবিএল সিকিউরিটিজ লি: এর তথ্য অনুযায়ি এই সময়ে ইনডাস্ট্রি টার্ন ওভার ছিল প্রায় $ ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের ৫ম বৃহত্তম চা রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু পরবর্তিতে দেশের আভ্যন্তরীন চাহিদা বৃদ্ধি পাওয় চা রপ্তানীর পরিমান কমে যাওয়া শুরু হয়ে।

বাংলাদেশে ভোক্তা পর্যায়ে চা পান করার পরিমান ২০০৯ সাল থেকে শতকরা ৭.১% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশি মানুষের মাঝে ইতিমধ্যে চা পানের উপর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এর পিছনে একটি কারণ ইহাও হতে পারে যে বাংলাদেশের মানুষের পার ক্যাপিটা ইনকাম বেড়েই চলছে। জনপ্রতি চা পান করার হার ১০০ গ্রাম থেকে ইতিমধ্যে ১৫০ গ্রামে পৌছে গিয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়ে যাওয়ার কারনে মানুষের এখন এক কাপের জাগায় দৈনিক কয়েক কাপ চা খাওয়ার সামর্থ তৈরি হয়েছে। সেই হিসাবে এদেশের সর্বমোট জনগোষ্ঠি হিসাব করলে সহজেই বুঝা যাবে যে আমাদের দেশে কত বড় চা পাতার ব্যবসার বাজার। কাজেই, এটা নি:সন্দেহে স্বীকার্য  যে, এদেশে চা পাতা ব্যবসার বাজার সম্ভাবনাও অনেক ভাল।

চা পাতা কিভাবে উৎপাদন করা হয়?

চা পাতা উৎপাদনের অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। যেমন, প্রথমে চা বাগানে চা পাতার চাষ করা হয়। সেখান থেকে পাতা সংগ্রহ করে ফ্যাক্টরিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর ফ্যাক্টরিতে কিছু প্রক্রয়া অনুসরনের পর চা পাতা বিক্রির উপযুক্ত হলে নিলামে উঠানো হয়। নিলামে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বায়ারগন অংশগ্রহনের মাধ্যমে চা পাতা বাল্ক কোয়ান্টিটিতে ক্রয় করে। এদের কাছ থেকে খুচরা এবং পাইকারি ব্যবসায়িরা ক্রয় করে বাজারজাত করে এন্ড ইউজারদের নিকট পৌছে দেয়।

চা পাতার ব্যবসা করতে কি কোন লাইসেন্স লাগে?

চা পাতা ব্যবসা করতে লাইসেন্স লাগে। তবে, আপনি চা পাতার ব্যবসাটি কোন পর্যায়ে করতে চান তা আপনাকে ঠিক করে নিতে হবে। তার আগে চলুন জেনে নেই, চা পাতা কোথায় কিনতে পাওয়া যায়? চা পাতা কেনার দু’টো উৎস রয়েছে। একটি হচ্ছে, বাংলাদেশ চা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত ব্যবসায়ি যার নিকট হতে চা ক্রয় করা যাবে। আর একটি উৎস হল নিলাম। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং শ্রীমঙ্গল এই দুই জাগায় নিলামে চা বিক্রি হয়। এই দুই উৎস থেকে চা কিনে প্যাকেটিং করে বাজারজাত করা হয়। এখন, আপনি যদি নিজস্ব ব্র্যান্ডে এই ব্যবসা শুরু করতে চান, তাহলে আপনার নিম্ন লিখিত লাইসেন্স লাগবে।

  • ট্রেড লাইসেন্স: ট্রেড লাইসেন্স আপনি ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা অথবা সিটি কর্পোরেশন থেকে করে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স করার সময় অবশ্যই একটি জিনিস মাথায় রাখতে হবে। আর তা হল ব্যবসার ধরন নির্বাচন। ট্রেড লাইসেন্স করার সময় ব্যবসার ধরনের জাগায় আপনাকে অবশ্যই “মোড়কজাত ও বাজারজাতকরারি” উল্লেখ করতে হবে। তা না হলে বিএসটিআই লাইসেন্স পেতে জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। ট্রেড লাইসেন্স আপনি যেখান থেকেই করেন না কেন, ট্রেড লাইসেন্স করার সময় আপনার ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা লাগবে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি যদি ভাড়া নিয়ে থাকেন তাহলে মালিকের সাথে ডিড এর কপি লাগতে পারে।

 

  • ট্রেড মার্ক :  চা পাতা ব্যবসা করার জন্য আপনি যে নামে বাজারজাত করবেন ঐ নাম অর্থাৎ ব্র্যান্ড নেইম এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লগো ট্রেড মার্ক করিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশর পেটেন্ট, ডিজাইন ও  ট্রেড মার্ক অধিদপ্তর যে কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পণ্যের ও লগো  ট্রেড মার্ক প্রদান করে থাকে। তবে, ট্রেড মার্ক করার ক্ষেত্রে ঐ নামটিই আপনাকে খুজে নিতে হবে যে নামে এখন পর্যন্ত ট্রেড মার্ক করা হয়নি।

 

  • বাংলাদেশ টি বোর্ডের লাইসেন্স : বাংলাদেশ টি বোর্ডের অফিস চট্টগ্রামে অবস্থিত। এখান থেকে লাইসেন্স সংগ্রহ করা তেমন কঠিন কোন বিষয় নয়। প্রয়োজনিয় কাগজপত্র জমা দিয়ে আপনি সহজেই লাইসেন্স করিয়ে নিতে পারেন। এখানেই সবচেয়ে গুরত্বপূর্ন বিষয় আপনাকে ঠিক করে নিতে হবে, তা হল আপনি কোন পর্যায়ে চা পাতার ব্যবসা করতে চান। এটি কিন্তু আগেও একবার উল্লেখ করা হয়েছিল। যাহোক, বাংলাদেশ টি বোর্ড বেশ কয়েকটি ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স প্রদান করে থাকে। তার মধ্যে প্রধান প্রধান কয়েকটি ক্যাটাগরি হল:
    • খুচরা – পাইকারি লাইসেন্স : যারা খুচরা বা পাইকারি পর্যায়ে ব্যবসা করবে তাদের জন্য।
    • বিডার লাইসেন্স : যারা নিলাম থেকে সরাসরি চা পাতা কিনবে ।
    • ব্লেন্ডার লাইসেন্স : যারা নিজস্ব ব্র্যান্ডে চা পাতা মোড়কজাত ও বাজার জাত করবে তাদের জন্য।

 

এবারে আসুন জেনে নেই, টি বোর্ডের লাইসেন্স পেতে কোন কোন কাগজ পত্র লাগে:

    • ট্রেড লাইসেন্স
    • টিন সার্টিফিকেট
    • পাসপোর্ট সাইজের ছবি
    • ব্যাংক প্রত্যয়নপত্র
    • প্যাকেটের নমুনা এবং
    • আবেদনকারির জাতীয় পরিচয়পত্র

 

  • বি এস টি আই লাইসেন্স : চা পাত ব্যবসা শুরু করার জন্য আগে যে সব লাইসেন্সের কথা আলোচনা করা হল তার মধ্যে  এই লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া হল সবচেয়ে কঠিন এবং সময় সাপেক্ষ। তবে, হতাস হওয়ার কিছু নেই। প্রয়োজনিয় কাগজ পত্র থাকলে বিএসটিআই প্রতিনিধি আপনার চা প্রক্রিয়াজাত করার ইউনিট  সরেজমিনে পরিদর্শন করবে। এভাবে সবকিছু ঠিক থাকলে আপনি তিন থেকে চার মাসের মধ্যে লাইসেন্সটি পেয়ে যেতে পারেন। বিএসটিআই লাইসেন্স শুধু তাদের জন্যই যারা নিজস্ব ব্র্যান্ডে মোড়কজাত করে চা পাতা বাজারজাত করবে।

 

চা পাতার ব্যবসা শুরু করতে আপনার পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত?

যে কোন নতুন ব্যবসা ছোট থেকে শুরা করাই হল বুদ্ধিমানের কাজ।  যদিও আপনার যথেষ্ট  টাকা বিনিয়োগের সংস্থান রয়েছে তা সত্ত্বেও, আমার উপদেশ, আপনি ছোট থেকেই শুরু করেন। কারন, সম্পূর্ণ  নতুন অবস্থায় ছোট থেকে চা পাতার ব্যবসা শুরু করলে আপনি বাস্তব ভিত্তিক কিছু জ্ঞান লাভ করতে পারবেন যা পরবর্তিতে আপনার কাজে লাগবে। এছাড়াও প্রথমে ছোট থেকে শুরু করলে, দুই-তিন বছর পর আপনার কিছু পকেট কাস্টমার তৈরি হয়ে যাবে যাদের উপর ভিত্তি করে আপনি পরে নিজস্ব ব্র্যান্ডে বা বড় আকারে চা পাতার ব্যবসায় নামতে পারেন। কাজেই, প্রথমে আপনি বাংলাদেশে বিদ্যমান চা কম্পানি থেকে ডিলারশীপ নিয়ে ব্যবসা শুরু করে বিভিন্ন দোকানে দোকানে সরবরাহ করতে পারেন।

 

স্বল্প পুঁজিতে চা পাতা ব্যবসা করে কেমন লাভ হতে পারে?

যারা স্বল্প পূঁজিতে ব্যবসা খুজছেন তাদের জন্য চা পাতার ব্যবসার এই আইডিয়াটি হতে পারে জীবন বদলানোর একটি উপায়। আপনি প্রথমে ৫০ জন চা বিক্রেতাকে নির্বাচন করতে পারেন যাদের নিকট আপনি প্রতিদিন ৫০০ গ্রাম করে চা পাতা সরবারহ করবেন। এতে ধরে নেই, ভাল মান সম্পন্ন প্রতি প্যাকেটের জন্য আপনার কেনা দাম ১২৫ টাকা, তাতে ৫০ প্যাকেটের জন্য আপনার সর্বমোট বিনিয়োগ হবে ৬২৫০ টাকা। আপনি এগুলো চা বিক্রেতার নিকট ১৪০ টাকা বা ধরলাম প্রথম প্রথম কাস্টমার ধরার জন্য একটু কমেই ১০ টাকা লাভে ১৩৫ টাকায় ছেড়ে দিলেন। তাতে আপনার দৈনিক লাভ হল ৫০০ টাকা আর মাসে ১৫০০০/- টাকা। এবার আপনিই ভেবে দেখুন, মাত্র ৬২৫০ টাকা বিনিয়োগে আপনার মাসে ১৫০০০/- টাকার ব্যবসা হচ্ছে। আর একটি কথা, নতুন ব্যবসায় কাস্টমার ধরে রাখতে হলে একটু বাকি দেওয়ার প্রয়োজন থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে, আপনি ৬২৫০ টাকার দুটি চালান ব্যবহার করতে পারেন। আজ সাপ্লাই দিলেন এবং কাল পুনরায় সাপ্লাই দিয়ে আগের দিনের টাকা নিয়ে নিলেন। তাতেও, ১২৫০০ টাকা বিনেয়োগে মাসে ১৫০০০ টাকা লাভ করা মোটেও ছোট খাট ব্যাপার নয়। এভাবে শুরু করে কয়েকমাস পার হওয়ার পর আপনি ৫০ টি দোকানের জাগায় ১০০ টি দোকন নির্বাচন করুন এবং পূর্বের নিয়মে সরবরাহ দিতে থাকুন। তখন, আপনার মাসিক লাভ হয়ে দাড়াবে ৩০০০০/- টাকা। তার পর দুই-তিন বছর পর দেখা যাবে আপনার ব্যবসার পরিধি আরোও বড় হয়ে যাবে এবং বেশ কিছু পকেট কাস্টমার তৈরি হয়ে যাবে। আর তখনই, আপনি নিজস্ব ব্র্যান্ডে চা পাতার ব্যবসা শুরুর পথে এগুতে পারেন যদি আপনার নিকট বিনিয়োগের সংস্থান থাকে।

 

এবার, আপনি কি চা পাতার ব্যবসা শুরু করতে চান?

সিদ্ধান্তটি নিতান্তই আপনার। আমি শুধু আমার আইডিয়াটি আপনার নিকট শেয়ার করলাম। আপনি আরও ভেবে-চিন্তে দেখুন, মাার্কেট সার্ভে করুন তারপর চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিন। আপনার কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্টের মাধ্যমে জানাতে ভুলবেন না কিন্তু। ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন। এছাড়া, আরোও কিছু নতুন ব্যবসার ধারনা পেতে লিংকে ক্লিক করুন।

1 thought on “চা পাতার ব্যবসা : স্বল্প পুঁজির একটি খুবই লাভজনক ব্যবসা।”

Comments are closed.