আপনি কি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে চিন্তিত? তাহলে আসুন জেনে নেই করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ নিয়ে করনিয় কিছু বিষয়। করোনা রোগটি যে ভাইরাস দ্বারা তৈরি তার নামকরণ হয়েছে কোভিড-১৯। বর্তমান বিশ্বে এই ভারাসটি মানুষের মাঝে এক ভয়াবহ রকমের আতংক সৃষ্টি করেছে। করোনা রোগ প্রতিরোধের জন্য অফিস, আদালত, শিল্প, কল-কারখানা, গন পরিবহন সবকিছুতেই লক ডাউনের কারনে এক অচল অবস্থা বিরাজ করছে। দিনের পর দিন ঘরের স্বেচ্ছা বন্দি জীবন আমাদের কাছে আর ভাল লাগছে না। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য কোন সরকারের পক্ষেও মাসের পর মাস যাবত এমন লক ডাউন চালু রাখা বাস্তব সম্মত নয়।

তাহলে কি করার? যে করোনা ভাইরাস বিশ্বের বড় বড় ক্ষমতাধর দেশের মানুষকেও ঘর বন্দি করতে সমর্থ হয়েছে, লক ডাউন পরবর্তি সময়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে সেই সেই করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি মেনে নিয়েই  দৈনন্দিন কাজে নামতে হবে? হ্যা, বিষয়টি অনেকটা সেরকমই।  কারণ এই করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ কে নির্মূল করতে যে পরিমান সময় লাগবে তা এখনও বিশেষজ্ঞ মহল এখনও নির্ধারণ করতে পারেনি। তাই, কোভিড-১৯ এর সাথে পরস্পর সহঅবস্থানের সক্ষমতা তৈরি করাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। এই সক্ষমতা হচ্ছে আপনার ভিতরে করোনা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তাহলে আসুন জেনে নেই, কোন পাঁচটি কাজ করলে আপনি কোভিড-১৯ এর সাথে সহঅবস্থানের সময় নিজের ভিতরে সেই সক্ষমতা তৈরি করতে পারবেন।

মহান আল্লাহ্ তায়ালার নিকট প্রকৃত তাওবার মাধ্যমে ফিরে আসা:

মহান আল্লাহ্ তায়ালা যিনি এই বিশ্ব ব্রম্মান্ডের সৃষ্টিকর্তা, আসমান-জমীনের সমস্ত কিছু যার নিয়ন্ত্রণে, তাওবার মাধ্যমে তার দিকে ফিরে আসা। আল্লাহ্ তায়ালার হুকুম-আহকাম অনুযায়ি নিজের জীবন অতিবাহিত করার স্বপথ গ্রহন করা। এই করোনা রোগ প্রতিরোধসহ ইহকাল-পরকালের অন্যান্য সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি লাভের জন্য খুব কাকুতি-মিনতির সাথে দোয়া করা।

শরীরে করোনা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা:

যে কোন রোগ প্রতিরোধের একটি প্রধান উপায় হল টিকা প্রদান। সুনির্দিষ্ট একটি রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির উপায় হল ঐ রোগের জীবানু দ্বারা তৈরিকৃত টিকা গ্রহন করা। কোন রোগের নতুন প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে ঐ রোগের টিকা নতুন ভাবে তৈরি করতে হয়। টিকা তৈরির পর তার কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য ক্লিনিকাল ট্রায়াল এর প্রযোজন হয়। ক্লিনিকাল ট্রায়াল সফলভাবে সমাপ্তির পর এর কার্যকারিত নির্নয় করা যায়। আমরা জানি, কোভিড-১৯ নামের ভাইরাস নতুনভাবে প্রাদুর্ভাব তৈরি করেছে। এই ভাইরাসের আর একটি বিশেষত্ত হচ্ছে, এটি বার বার মিউটেশনের মাধ্যমে রুপ পরিবর্তনে সক্ষম।
তাই সফলভাবে ক্লিনিকাল ট্রায়াল সমাপ্তির পর কোভিড-১৯ এর কার্যকর  টিকা উদ্ভাবন নিঃসন্দেহে একটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। এছাড়াও, বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া, তাপমাত্রা এবং বাতাসের আদ্রতা ভেদে কোভিড-১৯ মিউটেশনের মাধ্যমে এর পরিবর্তিত রুপ বিভিন্ন রকম হয়। এর ফলে এক দেশের উদ্ভাবিত টিকা অপর দেশের জন্য কার্যকর নাও হতে পারে। যাহোক, আসল কথা হচ্ছে আমাদের দেশের আবহাওয়ার প্রেক্ষাপটে একটি কার্যকর টিকা হাতে পেতে একটু সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। রোগ প্রতিরোধের জন্য সে পর্যন্ত অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তার আগেই জীবন-জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বের হতে হবে। আর তখন কোভিড-১৯ এর সাথে সাক্ষাত হলে হতেও পারে। এজন্যই কোভিড-১৯ এর সাথে সহঅবস্থান এবং বেচে থাকার লড়াইয়ে নিজের সক্ষমতা তৈরির প্রশ্ন।

তবে, কোভিড-১৯ এর বেলায় একটি ভাল দিক হল, এর দ্বারা আক্রান্তের প্রায় ৮০% এর ক্ষেত্রেই কোন প্রকার লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই ভাল হয়ে যায়। এর ফলে এই ৮০ শতাংশ মানুষ প্রাকৃতিক ভাবেই কোভিড-১৯ এর টিকা লাভ করে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা Immunity তৈরি হল যা অনেকটা Herd Immunity এর মত। তাহলে বাকি ২০ শতাংশ মানুষের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে পরাজিত করে কোভিড-১৯ ভাইরাস রোগের লক্ষণ প্রকাশে সমর্থ হয় এবং এদের জন্যই হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ রাখা দরকার। আবার এই ২০ শতাংশের মধ্যে ৫ শতাংশ আক্রান্ত রোগীর বেলায় হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে। আর এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হারও খুব বেশী নয়, মাত্র ২-৩ শতাংশের মত।

যাহোক অনেক কথা হয়ে গেল। এবার মুল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। উপরের আলোচনায় দেখা গেল, সমাজের ২০ শতাংশ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কোভিড-১৯ এর কাছে হেরে যাওয়ার ফলে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেল। এখন আমারতো জানা নেই যে, আমি প্রথম ৮০ শতাংশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নাকি বাকি ২০ শতাংশের মধ্যে। যেহেতু জানা নেই তাই আমাদের সবার জন্যই কোভিড-১৯ এর সাথে এক সাথে বাস করে বেচে থাকার সক্ষমতা তৈরির জন্য আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে হবে। আর এই প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির জন্য এই মুহুর্তে  যেহেতু কার্যকর Vaccine আপনার হাতে নেই, তাই বিকল্প হিসাবে গতানুগতিক ধারা অনুসরনের মাধ্যমেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাহলে এবার আসুন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই গতানুগতিক ধারাগুলি জেনে নেইঃ

  • শরীরে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি পুরা করা যা সরাসরি সূর্যের আলো থেকে লাভ করা যায়। এছাড়া ভিটামি ডি সমৃদ্ধ কিছু খাবার যেমন ডিমের কুসুম, চর্বি বিশিষ্ট মাছ, গরুর কলিজা, মাশরুম, পনির ইত্যাদি থেকেও লাভ করা যায়। তবে, উভয় পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে ভিটামিন ডি গ্রহন করাই বিশেষজ্ঞ মহলের পরামর্শ।
  • ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন, আমলকি, লেবু, কমলা, পেয়ারা ইত্যাদি ফলমুল বেশী করে গ্রহন করা।
  • অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য যেমন দুধ, ডিম, মাংস ইত্যাদি খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা।
  • পর্যাপ্ত পরিমানে পানি পান করা, কুসুম গরম হলে ভাল হয়।
  • মনের ভিতর কোন প্রকরা দুশ্চিন্তা বা ভয় ভীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়া।

করোনা রোগ প্রতিরোধের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও রাষ্ট্রিয় অনুশাসন মেনে চলা:

এই ক্ষেত্রে আপনাকে রাষ্ট্রিয় অনুশাসন ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে হবে। মাস্ক পরিধান করতে হবে, সামাজিক দুরত্ব এবং শারীরিক দুরত্ব অবশ্যই বজায় রেখে চলতে হবে। হ্যান্ড স্যানিটাইজার সাথে রেখে বার বার হাত স্যানিটাইজ করতে হবে। কাজ শেষে ঘরে প্রবেশের পর সোজা বাথরুমে ঢুকে পরিধেয় কাপড় খুলে সাবান পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে এবং খুব ভাল করে সাবান দিয়ে গোসল করে পরিবারের লোকদের মাঝে ফিরে আসতে হবে।

করোনা রোগ মোকাবেলায় প্রতিদিন ব্যায়াম করা :

প্রতিদিন নিয়মিতভাবে শারীরিক ব্যায়াম করা আমাদের প্রত্যেকের জন্যই আবশ্যক। এর দ্বারা শরীরে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন প্রকার অসুখ-বিসুখ থেকে বেচে থাকা যায়। বাইরে ব্যায়ামের পরিবেশ না থাকলে আপনি ট্রেডমিলের মাধ্যমে ঘরে থেকেও প্রতিদিনের শারীরিক ব্যায়াম করে নিতে পারি। এর ফলে দেহের মধ্যে এক ধরণের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও তৈরি হয়।

করোনা প্রতিরোধের জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য সময় বরাদ্দ রাখা:

: কমপক্ষে ছয় ঘন্টা ঘুমে কাটানোর বিষয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই সময় ঠিক করে নেওয়া প্রয়োজন। এই ঘুমের সময়সূচি এইভাবে করা যাতে সময়মত ফজরের নামাজ আদায় করা যায় এবং এরপর সকালের বিশুদ্ধ বাতাসে কিছুক্ষণ হাটা-চালা করা যায়।